রাজনীতি

দেওয়ানগঞ্জে শ্যামল চন্দ্র সাহার ক্ষমতার উৎস কোথায়? আ.লীগের দোসর থেকে নব্য রূপ!

মাসুদুর রহমান, জামালপুর প্রতিনিধি | ৮ মার্চ, ২০২৬

নারী কেলেঙ্কারি, মেগা প্রকল্পে অনিয়ম এবং পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ দোসর হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত ব্যবসায়ী শ্যামল চন্দ্র সাহাকে ঘিরে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ‘দূর্গা এন্টারপ্রাইজ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং স্থানীয়ভাবে ‘শ্যামল দাদা’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তির খুঁটির জোর কোথায়—তা নিয়ে জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন। সরকার পরিবর্তনের পরও কীভাবে তিনি বহাল তবিয়তে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ ও ঠিকাদারী সাম্রাজ্য জানা যায়, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শ্যামল সাহার অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটে। এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা প্রকৌশল, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তিনি একচেটিয়া ঠিকাদারী নিয়ন্ত্রণ করতেন। জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় তার ইশারায় চলতো টেন্ডার প্রক্রিয়া। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি প্রায় শত কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় তার নামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দূর্গা এন্টারপ্রাইজের নির্মাণাধীন টাঙ্গাইলের একটি পিসি গার্ডার ব্রিজ ভেঙে পড়লেও ক্ষমতার দাপটে শ্যামলকে কেউ স্পর্শ করতে পারেনি।

এমপি-মন্ত্রীদের সাথে সখ্যতা ও অর্থায়ন জামালপুরের তৎকালীন সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ এবং প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন শ্যামল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এমপি-মন্ত্রীদের বাড়িতে নিয়মিত নদীর তাজা মাছ ও মৌসুমী ফল পাঠিয়ে তাদের মন জয় করতেন। তিনি এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, সাধারণ নেতাকর্মীরা যখন এমপি-মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ পেতেন না, তখন শ্যামল সাহা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি একচেটিয়া ঠিকাদারী ও ডিলারশিপ বাগিয়ে নেন।

শুধু তাই নয়, ব্যবসায়ী নেতা এ কে আজাদের সাথে নিউইয়র্কে গিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপিদের সাথে ফটোসেশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে ব্যবসায়িক ফায়দা লুটতেন। এমনকি শেখ হাসিনার সাথে জাতিসংঘের সফরসঙ্গী হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিপুল অর্থায়ন এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমাতে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে তিনি অর্থ যোগান দিয়েছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে।

মদ পাচার ও নারী কেলেঙ্কারি শ্যামল সাহার বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক দুর্নীতিই নয়, রয়েছে নৈতিক স্খলনের গুরুতর অভিযোগ। ২০০৯-২০১০ সালের দিকে তিনি এক ভাসমান পতিতাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন বলে তথ্য রয়েছে। এছাড়া দেওয়ানগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা হালিম দুলালের মতে, আওয়ামী লীগের এক যুগেরও বেশি শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে শ্যামল সাহা তার ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি দামি মদ ও চোরাই মদ সাপ্লাই দিতেন। ২০২৫ সালে বিপুল পরিমাণ মদসহ দূর্গা এন্টারপ্রাইজের একটি ট্রাক আটকও হয়েছিল।

পট পরিবর্তনের পরও নব্য রূপ! ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পলায়নের পরও থেমে নেই শ্যামল সাহা। বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি এখন বিএনপির কিছু নেতাকে ম্যানেজ করে তার ব্যবসার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে এলজিইডি ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী কর্তৃক প্রায় ২২ কোটি ২৬ লাখ ৬২ হাজার টাকার একটি দরপত্র (প্যাকেজ নং- LGED/W-15A/Bridge-Culvert-16) আহ্বান করা হয়। সেখানে দূর্গা এন্টারপ্রাইজ অন্য এক ঠিকাদারের সাথে জেভি (Joint Venture) করে অংশ নেয় এবং ৫.০৬% কম দরে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ‘নোটিফিকেশন অফ অ্যাওয়ার্ড’ (NOA) পায়। ব্যাংকের মাধ্যমে জামানতের টাকা জমা দিলেও, গত ৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেননি।

জনমনে ক্ষোভ ও অভিযুক্তের নীরবতা স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, পতিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের ব্যবসা সম্প্রসারণে কারা সাহায্য করছে? একজন ব্যক্তি বছরের পর বছর কীভাবে এত দাপট দেখাতে পারেন?

স্থানীয় বাসিন্দা হালিম দুলাল বলেন, “প্রশাসন এখনই কার্যকর তদন্ত ও ব্যবস্থা না নিলে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।”

এদিকে, এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে শ্যামল চন্দ্র সাহার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button