অপরাধঅব্যাবস্থাপনাদুর্নীতি

বিপিসিতে আহম্মদুল্লাহর দুর্নীতির সাম্রাজ্য, নিয়োগ-টেন্ডার সিন্ডিকেটে শতকোটি লুটের অভিযোগ

মুহাম্মদ জুবাইর

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব ও উপব্যবস্থাপক মো: আহম্মদুল্লাহকে ঘিরে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি,নিয়োগ জালিয়াতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত অভিযোগ সামনে এসেছে।বিপিসির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে,২০১৯ সালে বিপিসিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এবং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চেয়ারম্যান মো: সামছুর রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার সূত্রে বিপিসিতে চাকরি পান আহম্মদুল্লাহ। কথিত আছে, তিনি এক সময় সামছুর রহমানের মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন এবং সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই এই নিয়োগ পান। তবে তার নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরেই রয়েছে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ। ঝালকাঠি সদর উপজেলার দিবাকর কাঠি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে চাকরিতে যোগ দেন। রাজনৈতিক প্রভাব নিশ্চিত করতে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কমিটির সক্রিয় সদস্য ও পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করে প্রত্যয়নপত্র জমা দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি বিপিসির অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

চাকরিতে যোগদানের পর তার প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। বিপিসিতে চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি সাধারণত সহকারী ব্যবস্থাপক বা ৯ম গ্রেডের সমমানের হলেও তিনি উপব্যবস্থাপক বা ৬ষ্ঠ গ্রেডে থেকেও বছরের পর বছর সেই পদে বহাল রয়েছেন। বিপিসির প্রবিধানমালা অনুযায়ী এটি নিয়মবহির্ভূত হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ থাকলেও তার প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না বলে জানা গেছে।

২০২১ সালের ৩ অক্টোবর তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ দুর্নীতির অভিযোগে তাকে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে বদলি করার আদেশ দেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সেই আদেশ বাতিল হয়ে যায় এবং আহম্মদুল্লাহ আবারও আগের পদে ফিরে আসেন। বিপিসির ভেতরে এই ঘটনাকে তার অদৃশ্য ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

দীর্ঘ সময় একই পদে থেকে আহম্মদুল্লাহ বিপিসিতে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ভবন। এছাড়া মিরপুর এলাকায় দুটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা, কোটি কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ার কেনার তথ্যও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, গোপন লকারে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ মজুদ রাখার পাশাপাশি স্ত্রী ও স্বজনদের নামেও বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি।
বিপিসিতে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে তিনি ‘বরিশাল সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে, যাদের অধিকাংশই তার নিজ অঞ্চলের বলে জানা গেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে উপব্যবস্থাপক মো: আশিক শাহরিয়ারের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অঘোষিত ক্যাশিয়ার হিসেবে বিভিন্ন ডিপো ও রিফাইনারি থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও মাত্র তিন বছর ১৭ দিনের মধ্যে তার পদোন্নতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এছাড়া বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউস, লিয়াজো অফিস এবং অধীনস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের নিয়োগ দিয়ে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করেছেন আহম্মদুল্লাহ। তার বিরাগভাজন হওয়ায় অনেক দক্ষ কর্মকর্তা বদলি বা চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিপিসির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এসপিএম প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প এবং ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগ ও বিভিন্ন ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া দেশের একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের ব্যাংকগুলোতে বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকা জমা রাখার ব্যবস্থাও করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বিনিময়ে নিজের আত্মীয়দের ওইসব ব্যাংকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। বর্তমানে সেই ব্যাংকগুলোতে বিপিসির প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি রিফাইনারি থেকে মাসিক মাসোয়ারা গ্রহণ, বিটুমিন ও ক্রুড অয়েল আমদানির অনুমোদন পাইয়ে দিতে শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাও তার সঙ্গে জড়িত।

সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন ও জ্বালানি বিল বাবদ ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫১ টাকা উত্তোলন এবং সাবেক চেয়ারম্যানকে খুশি করার নামে একটি চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এসি কেনার জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট ব্যাংক লেনদেনের তথ্যও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিপিসির নিয়োগ বাণিজ্যের অন্যতম মূল হোতা হিসেবেও তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্তাবাহক পদে ভুয়া ঠিকানায় নিয়োগ দিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলেও তিনি এখনও দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নিজের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আহম্মদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, তিনি দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার নিজ জেলা ঝালকাঠি। অন্য সব অভিযোগ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button