দুর্নীতিপ্রশাসন

শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল; তদন্তে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ০৮ মার্চ, ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডিরই এক কর্মকর্তার দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অভিযোগে বলা হয়েছে, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা বেলাল হোসেন ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে এই পাহাড়সম সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাব ও ভুয়া বিল উত্তোলন

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের প্রভাব খাটিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি করেছেন বেলাল হোসেন। মন্ত্রীর নির্দেশে প্রায় ৪০টি প্রকল্পের কোনো কাজ না করিয়ে শতভাগ বিল উত্তোলন করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) থাকা অবস্থায় পূর্বের না করা রাস্তাগুলোর ওপর পুনরায় বরাদ্দ দিয়ে কাজ সম্পন্ন দেখান। তবে সেই সময়ের অনেক ব্রিজ ও কালভার্টের কাজ এখনও অসম্পন্ন রয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য

দীর্ঘ সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে:

  • দলীয় নিয়োগ: ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সুপারিশে প্রায় ১১২৫ জন ছাত্রলীগ কর্মীকে এলজিইডিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চাকরি দেন তিনি। পদ অনুযায়ী জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
  • অবৈধ পদোন্নতি: সার্ভেয়ার এবং কার্য সহকারী পদের কর্মীদের কাছ থেকে ১০-১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব/ভারপ্রাপ্ত/অতিরিক্ত দায়িত্ব) পদে পদায়ন করেছেন। সারাদেশে এভাবে ৪১২ জনকে অবৈধ পদোন্নতি দিয়ে তিনি ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
  • বদলি বাণিজ্য: জনপ্রতি ১০-১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে অবৈধভাবে বদলি বাণিজ্য করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় ও দুদকের অভিযান

অভিযোগে বলা হয়, বেলাল হোসেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালীন এলজিইডির মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির ‘স্বর্ণযুগ’ চলছিল। তার সময়ে কাজ না করে বিল উত্তোলন ও অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ উঠলেও তিনি কারও বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা রুজু করেননি। তার এই নীরবতার কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাধ্য হয়ে একযোগে তিন জেলায় অভিযান পরিচালনা করেছিল।

পাহাড়সম অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি

অবৈধ আয়ের মাধ্যমে বেলাল হোসেন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • রাজধানীর মিরপুর-১০ এ ২৬০০ বর্গফুটের বিশাল ফ্ল্যাট।
  • রাজধানীর মিরপুর-২ এ ১৫০০ বর্গফুটের আরও একটি ফ্ল্যাট।
  • পূর্বাচলে ৫ কাঠার প্লট।
  • রংপুর জেলার ধাপ এলাকায় ৬ কাঠা জমির ওপর দুই ইউনিটের ৫ তলা বাড়ি।
  • কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে প্রায় ২১০ বিঘা কৃষিজমি।

অভিযুক্তের বক্তব্য এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বেলাল হোসেনের বক্তব্য জানতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো উল্লেখ করে তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

দুদকের তদন্ত শেষে এই শত কোটি টাকার দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button