অন্যান্য

সাংবাদিকতা শিক্ষার পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের জীবনাবসান

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান আর নেই। রোববার রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

জানা গেছে, কয়েক দিন আগে ব্রেন স্ট্রোক করার পর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, দুই নাতিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ছাত্র-শিষ্য রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের গণমাধ্যম অঙ্গন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সাংবাদিকতা শিক্ষায় অবিস্মরণীয় অবদান বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষাকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার পেছনে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রায় তিন দশকের বেশি সময় এই পেশায় যুক্ত ছিলেন।

তাঁর উদ্যোগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগটির নাম পরিবর্তন করে ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ’ রাখা হয়। এছাড়া, ডিপ্লোমা কোর্সের পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদি এবং পরবর্তীতে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালুর পেছনেও তাঁর যুগান্তকারী ভূমিকা ছিল। শ্রেণিকক্ষে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা দিতেন তিনি।

জন্ম, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ১৯৪১ সালের ৩০ নভেম্বর নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার ধনুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এবং ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ চালু হলে তিনি এর প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন এবং প্রায় এক দশক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদক থেকে শুরু করে সম্পাদনা পর্যায়ে দক্ষতার সাথে কাজ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ও অন্যান্য দায়িত্ব পালন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অধ্যাপক খান সংগঠক ও পরামর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বাড়িটি সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্বাধীনতার পর তাঁর লেখা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এছাড়াও তিনি কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এবং প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ উপাচার্য, রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী, সচিব, সম্পাদক, বিচারকসহ দেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের প্রয়াণে দেশ একজন সত্যিকারের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক ও সত্যের পথপ্রদর্শককে হারাল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button