আওয়ামী লীগের খোলস পাল্টে আনোয়ারার চান্দু-রাহুল এখন বিএনপির ‘বড় নেতা’

নিজস্ব প্রতিবেদক | আনোয়ারা, চট্টগ্রাম
বিগত ১৫ বছর ধরে তাঁরা ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেছেন তাঁরা। এখন তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ‘বড় নেতা’ হিসেবে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সদ্য সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সুশীল ধর (চান্দু) এবং তাঁর ছেলে রাহুল ধরের বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়ে এখনো বঞ্চনার শিকার হলেও, এই পিতা-পুত্র এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিএনপি নেতাদের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দখলদারি ও নতুন রাজত্ব স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে সুশীল ধর চান্দু ছিলেন আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য এবং তাঁর ছেলে রাহুল ধর ছিলেন যুবলীগ নেতা। বর্তমানে রাহুল নিজেকে আনোয়ারা উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের ‘বিশাল নেতা’ হিসেবে দাবি করছেন। অভিযোগ উঠেছে, নামে-বেনামে ভুয়া দলিল সৃজন করে নিরীহ মানুষের জায়গা দখল করে রাহুল এখন আনোয়ারার ‘অঘোষিত সম্রাট’ হয়ে উঠেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, ছাত্র-আন্দোলন দমাতে আওয়ামী লীগের হয়ে এই পিতা-পুত্র তাঁদের নিজস্ব বাহিনী নিয়ে আনোয়ারার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং অর্থ জোগান দিয়েছেন। বিগত ১৭ বছর ধরে নির্বাচন আসলেই তাঁরা নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোট চেয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। উপজেলা ও জেলার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে তাঁদের নিয়মিত ওঠাবসা ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, “বিগত ১৭ বছর চান্দু ও রাহুলকে আমরা আওয়ামী লীগ-যুবলীগ নেতা হিসেবেই চিনতাম। তারা বিভিন্ন সময় নৌকার ভোট চাইতে আমাদের বাড়িতেও এসেছেন। ৫ আগস্টের পর তারা কীভাবে বিএনপির কাতারে স্থান পেলেন, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।”
গোপন ভিডিও ও মামলার হুমকি সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে ৫ আগস্ট-পরবর্তী তাঁদের গোপন তৎপরতা নিয়ে। সরকার পতনের পর ছাত্র সমন্বয়করা আনোয়ারা থেকে আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর নাম ও ছবি সংবলিত বিভিন্ন স্থাপনা মুছে ফেললে বা ভেঙে ফেললে, চান্দু ও রাহুল গোপনে সেগুলোর ভিডিও ধারণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব ভিডিও ফুটেজ তাঁরা দ্রুত দুবাইয়ে পলাতক সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ এবং রিদুয়ানুল করিম সায়েমের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেসব ফুটেজ ব্যবহার করে পলাতক ওই নেতারা ছাত্র সমন্বয়ক ও বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দিচ্ছেন।
তৃণমূল বিএনপিতে চরম ক্ষোভ আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এসব দোসরকে বিএনপিতে ভিড়তে দেওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। যেকোনো সময় এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- আনোয়ার হোসেন (যুগ্ম আহ্বায়ক, আনোয়ারা উপজেলা কৃষক দল): “সুশীল ধর চান্দু ও তাঁর ছেলে রাহুল ধরকে বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে দেখেছি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরপরই এই বাপ-বেটাকে হঠাৎ বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিলে দেখতে পাচ্ছি।”
- সাইফুল আলম (বিএনপি নেতা, আনোয়ারা): “দলের সুদিনে অনেকেই বিএনপিতে ভিড় করবে। চান্দু ও রাহুল মূলত আওয়ামী লীগের দোসর। তাদের বিষয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে।”
- শামসুল আলম (বিএনপি নেতা, আনোয়ারা): “আনোয়ারা উপজেলা বিএনপিতে সুশীল ধর চান্দু ও রাহুল ধর নামের কাউকেই আমরা চিনি না।”
অভিযোগ অস্বীকার এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সুশীল ধর চান্দু ও রাহুল ধরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা দুজনেই সবকিছু অস্বীকার করেন। তাঁরা দাবি করেন, বিগত দিনে তাঁরা কখনোই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।



