অব্যাবস্থাপনা

জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে: ভেজাল ওষুধ ও আন্ডাররেট বাণিজ্যে বেপরোয়া এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ, নীরব ঔষধ প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের রহমতনগরে অবস্থিত এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড আবারও গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভেজাল, নিম্নমানের ও মানবহির্ভূত ওষুধ উৎপাদন এবং অস্বাভাবিক কম দামে (আন্ডাররেট) বাজারজাত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চললেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (DGDA) রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী সদস্যদের সঙ্গে অবৈধ সমঝোতার মাধ্যমে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ (উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১) তাদের এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নিষিদ্ধ ডিসপ্রিনের ‘ছদ্মবেশে’ এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’ জানা গেছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাথাব্যথার ট্যাবলেট ‘ডিসপ্রিন’-এর আদলে এলবিয়ন ‘এসপ্রিন’ নামে একটি ট্যাবলেট বাজারে দেদারসে বিক্রি করছে। অন্য কোনো কোম্পানি যখন নিষিদ্ধ এই ওষুধ উৎপাদন করছে না, তখন এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’ এককভাবে বাজার দখল করেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ডিসপ্রিনের মতো পানিতে দ্রুত দ্রবীভূত হওয়ার কথা থাকলেও এলবিয়নের এসপ্রিন পানিতে ঠিকভাবে গলে না, যা এর মান নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি করেছে।

লেবেল মূল্য ও বাজার মূল্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার পাইকারি বাজারগুলোতে এলবিয়নের উৎপাদিত ওষুধের লেবেলে মুদ্রিত দাম এবং বিক্রয় মূল্যের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে। এত কম দামে ওষুধ বিক্রি হওয়া প্রমাণ করে এর কাঁচামাল বা মান নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

নিম্নে কয়েকটি ওষুধের মূল্যের তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:

ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের ভয়াবহ প্রতিবেদন ও কারখানার বেহাল দশা ২০১৭ সালের এক ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিবেদনে এলবিয়নের ওষুধের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। সে সময় তাদের তৈরি ‘মিমক্স ৫০০ মি.গ্রা’ ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন-এর কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তৎকালীন সরকারি বিশ্লেষক ডা. মো. হারুন-অর-রশীদ তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলেন, পরীক্ষিত নমুনায় অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত না হওয়ায় এটি সম্পূর্ণ মানবহির্ভূত। এছাড়া ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলেও ঘোষিত মাত্রার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জিএমপি (Good Manufacturing Practice) নীতিমালা চরমভাবে লঙ্ঘন করে একই ভবনে পশু ও মানুষের ওষুধ উৎপাদনের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

অতীতের রেকর্ড: বারবার স্থগিতাদেশ ও সিলগালা এলবিয়নের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। মানবহির্ভূত ওষুধ তৈরির অভিযোগে একসময় চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও এলাকায় তাদের কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করে দিয়েছিল। পরে তারা সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, এর আগে ২০০৮ সালে এলবিয়নের ডাইক্লোফেনাক টি-আর, ডক্সিসাইক্লিন, গ্লাইসো ফুলভিন এবং আইবুপ্রোফেন ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত স্থগিত করা হয়। ২০০৯ সালে পলিভিট সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় সেটিরও উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছিল।

দুর্নীতির অভিযোগ ও জনস্বাস্থ্যে ভয়াবহ হুমকি একাধিক গুরুতর অভিযোগ, কারখানায় জিএমপি লঙ্ঘন এবং সিলগালা হওয়ার পরও এলবিয়ন কীভাবে বছরের পর বছর উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে—তা নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এলবিয়নকে ‘ছায়া সুরক্ষা’ দিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চরম সতর্কতা প্রকাশ করে বলেছেন, “নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারের ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এলবিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে কঠোর নজরদারির আওতায় না আনলে দেশের জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button