
মুহাম্মদ জুবাইর
পাহাড়খেকোদের সাম্রাজ্যে চিরুনি অভিযান,শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে ঘিরে তোলপাড় সলিমপুর

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছে র্যাব ৭,বাংলাদেশ সেনাবাহিনী,পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছিল। সেখানে অবৈধ অস্ত্র মজুদ,অস্ত্র তৈরির কারখানা,পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য,মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বহু বছর ধরে এই অঞ্চল কার্যত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সাধারণ মানুষ সেখানে ভয়ভীতির মধ্যে বসবাস করছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে,গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে র্যাব সদস্যরা একটি অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানের সময় পাহাড়ের বিভিন্ন আস্তানায় অবস্থান নেওয়া সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।হঠাৎ এই হামলায় চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন এবং তারা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে অন্যান্য র্যাব সদস্যরা আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজন র্যাব সদস্যকে মৃত ঘোষণা করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। এরপর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযান চালানোর প্রস্তুতি শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ০৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে ভোর আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিট থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ব্যাপক যৌথ অভিযান শুরু করা হয়। সেনাবাহিনী,র্যাব,পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। র্যাবের প্রায় ৪০০ সদস্যসহ মোট ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্য অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী। এলাকার সব প্রবেশ ও বাহিরের পথগুলোতে বসানো হয় কঠোর তল্লাশিচৌকি। যাতে করে কোনো সন্ত্রাসী পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য পাহাড়ি পথগুলোতেও নজরদারি জোরদার করা হয়।
।
অভিযান চলাকালে জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী আস্তানায় চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়।দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত এই তল্লাশি অভিযানে মোট ২২ জনকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে যৌথবাহিনী বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র যার মধ্যে একটি বিদেশি পিস্তল,একটি দেশীয় পিস্তল এবং একটি এলজি। এছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে ২৭টি পাইপগান,৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন,৫৭টি অস্ত্র তৈরির পাইপ,৬১টি কার্তুজ এবং বিভিন্ন ধরনের ১১১৩ রাউন্ড গুলি। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে ১১টি ককটেলসহ বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চলাকালে পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামও জব্দ করে। এছাড়াও অপরাধীদের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ১৯টি সিসি ক্যামেরা,৩টি ডিডিআর,১টি পাওয়ার বক্স এবং ২টি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন,এই সিসি ক্যামেরা ও নজরদারি সরঞ্জামের মাধ্যমে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে বসে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত।
অভিযানের সময় আলীনগর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের আস্তানা এবং অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত একাধিক ওয়াচ টাওয়ারও ভেঙে ফেলা হয়। এসব ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা দূর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গমনাগমন পর্যবেক্ষণ করত এবং নিজেদের মধ্যে সংকেত পাঠিয়ে দ্রুত লুকিয়ে পড়ত বলে জানা গেছে।
অভিযান শেষে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অস্থায়ীভাবে দুটি পুলিশ ও র্যাব ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছেন যাতে করে সন্ত্রাসীরা পুনরায় সংগঠিত হতে না পারে। এই অভিযানের ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে। অনেকেই দীর্ঘদিন পর নিজেদের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত উপস্থিতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
জঙ্গল সলিমপুর মূলত সরকারি পাহাড় দখল করে গড়ে ওঠা একটি বিশাল এলাকা। প্রায় তিন হাজার একশ একর বা প্রায় সাড়ে বারো কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হয়। প্রায় চার দশক ধরে পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। বর্তমানে সেখানে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে,পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে তা বিক্রি করা এবং সেই প্লট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেই এলাকাটিতে শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে দিনরাত সশস্ত্র পাহারায় থাকে সন্ত্রাসীরা এবং বাইরে থেকে কেউ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারে না। অনেকেই এই এলাকাকে পাহাড়খেকোদের অঘোষিত সাম্রাজ্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী,এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে,নোয়াখালী থেকে এসে তিনি প্রথমে ভিক্ষা ও কুলির কাজ করতেন। পরে ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তার নিয়ন্ত্রণে প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে,জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় অস্ত্র তৈরি,অস্ত্র পরিষ্কার করা এবং অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। অনেকেই ইয়াসিনকে ওই এলাকার অঘোষিত শাসক বা ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেও উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে,চট্টগ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত অনেক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এমনকি র্যাব সদস্য হত্যার ঘটনাতেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
যৌথবাহিনীর এই অভিযানের সময় ইয়াসিন পালিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন,অভিযানের সময় তিনি বোরকা পরে এলাকা থেকে পালিয়ে যান। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতারের জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,জঙ্গল সলিমপুরে এই বড় ধরনের অভিযানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ,অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের নেটওয়ার্ক দুর্বল করা সম্ভব হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন,এলাকায় স্থায়ীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য অনেকটাই কমে আসবে। অনেকেই দাবি করেছেন,এলাকায় সেনাবাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সন্ত্রাসের এই ঘাঁটি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হবে।



