আন্দোলন

ছাত্র আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রাজকীয় উত্থান’: অপবাদ ঘুচিয়ে গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক

মো: শাখায়েত হোসেন

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। তবে এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ভিত্তিগুলোর একটি তৈরি করে দিয়েছিল দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। একসময় যাদেরকে ‘টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কেনার জায়গা’ বা ‘মুরগির ফার্ম’ বলে তাচ্ছিল্য করা হতো, সেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাই রাজপথে রক্ত দিয়ে রচনা করেছেন বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির নতুন এক ইতিহাস।

অপবাদ ঘোচানোর শুরু এবং ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন ১৯৯২ সালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। বর্তমানে দেশে প্রায় ১১৫টির মতো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শুরুর দিকে এসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি না থাকায় অনেকেই মনে করতেন এদের কোনো বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর নেই।

কিন্তু এই ধারণার প্রথম পরিবর্তন আসে ২০১৫ সালে। শিক্ষার ওপর সরকারের আরোপিত ভ্যাটের বিরুদ্ধে জুনে শুরু হওয়া আন্দোলন সেপ্টেম্বরে এসে রূপ নেয় বিশাল বিক্ষোভে। ড্যাফোডিল, ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক, নর্থ সাউথসহ বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা “শিক্ষায় ভ্যাট কেন, শিক্ষা কি পণ্য?” স্লোগানে পুরো ঢাকা অচল করে দেয়। ছাত্রলীগের হামলা ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলায় সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

২০১৮: কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ২০১৮ সালের এপ্রিলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনে অভূতপূর্ব সাড়া দেয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কর্পোরেট ক্যারিয়ারের দিকে ঝুঁকে থাকা এই শিক্ষার্থীরা মূলত তাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাই-বোনদের অধিকার আদায়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নামে।

একই বছর ২৯ জুলাই রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর শুরু হওয়া ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলনেও তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস সেসময় রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি না থাকায় পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলার মুখেও তারা অবিশ্বাস্য সাহসিকতার সাথে লড়াই চালিয়ে যায়।

২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব: আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ‘রাজকীয় উত্থান’ দেখেছে গোটা বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ মন্তব্যের জেরে ফুঁসে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুতে পুরো দেশের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। ১৭ জুলাই সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছুটি ঘোষণা করে জোরপূর্বক শিক্ষার্থীদের হলছাড়া করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

ঠিক তখনই, ১৮ জুলাই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই দিনটি বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য দিন হয়ে থাকবে। ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, আইইউবি, এআইইউবি, ইউআইইউ, ড্যাফোডিল, গ্রিন ইউনিভার্সিটিসহ প্রায় প্রতিটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থীদের দমাতে হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও পুলিশ উদ্ধারের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। এদিন বেশ কয়েকজন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

১৮ জুলাই রাতে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরও ১৯ জুলাইয়ের ভয়াল দিনে তারা রাজপথ ছাড়েনি। তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখেই সরকার কারফিউ এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে বাধ্য হয়। ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলেও, অভিনব উপায়ে তারা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই রক্তক্ষরণ পুরো বাংলাদেশকে জাগিয়ে তোলে।

পরবর্তীতে ডিবি কার্যালয়ে সমন্বয়কদের আটকে রাখা, ১ আগস্ট তাদের মুক্তি, ৩ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের ডাক এবং অবশেষে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার লংমার্চ—সবকিছুতেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল নিরবচ্ছিন্ন।

রক্তস্নাত বিজয় এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, ২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থানে ৫০ জনেরও বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী। তারা প্রমাণ করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করেও শুধু দেশপ্রেম এবং অধিকারবোধ থেকে একটি সফল আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস অনেক পুরনো ও সমৃদ্ধ হলেও, ২০২৪ সালে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের এই আত্মত্যাগ ও রাজকীয় উত্থান সেই ইতিহাসকে এক নতুন মাত্রা দান করেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button