অন্যান্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা শিক্ষার পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান আর নেই

বিল্লাল বিন কাশেম

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ইন্তেকাল করেছেন। রোববার রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে স্ট্রোক করার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার রাতে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে, দুই নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ছাত্র-শিষ্য রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের গণমাধ্যম অঙ্গন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ১৯৪১ সালের ৩০ নভেম্বর নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধনুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের পাঠ চুকিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিচ্ছেদ্য। ১৯৬২ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের যাত্রা শুরু হয়, তখন তিনি ছিলেন প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে প্রায় এক দশক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিকতা করার পর, ১৯৭২ সালে তিনি নিজ বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

তাঁর হাত ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে বড় ধরনের একাডেমিক সংস্কার আসে। তাঁর উদ্যোগেই বিভাগটির নাম পরিবর্তন করে ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ’ রাখা হয় এবং ডিপ্লোমা কোর্সের পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদি (পরবর্তীতে চার বছর) অনার্স কোর্স চালু করা হয়। যা দেশের সাংবাদিকতা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বড় ভূমিকা রাখে।

শিক্ষকতার বাইরেও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়াও তিনি কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এবং প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর ৩০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি, এবং তিনি নিজে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের তিন দশকেরও বেশি সময়ের শিক্ষকতা জীবনে তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের উপাচার্য, মন্ত্রী, সচিব, সম্পাদক, বিচারক এবং বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিকতা শিক্ষার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button