প্রাকৃতিক দুর্যোগ

রাজপথের পর বন্যার স্রোতে যুদ্ধ: নোয়াখালীতে বুক সমান পানিতে বাড়ি ফেরার এক রুদ্ধশ্বাস গল্প

মো: শাখায়েত হোসেন

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া তরুণেরা এবার মুখোমুখি হয়েছিল প্রকৃতির ভয়াল রূপের। ২৫ আগস্ট, ২০২৪। সারা দেশের মতো নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখন বন্যার পানিতে ভাসছে। ঢাকা থেকে ত্রাণ ও সহায়তার চিন্তা নিয়ে নিজ গ্রাম নোয়াখালীর কেন্দুরবাগে ফিরছিলেন মো. শাখায়েত হোসেনসহ ছয় তরুণের একটি দল, যাদের মধ্যে চারজনই ‘জেন জি’ প্রজন্মের। কিন্তু তাদের এই ফেরাটা যে এতটা লোমহর্ষক হবে, তা হয়তো কেউই ভাবেননি।

সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নোয়াখালীর চৌরাস্তায় পৌঁছায় দলটি। সেখান থেকে গন্তব্য কেন্দুরবাগ। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। একটি পিকআপে চেপে বসলেও বৈরী আবহাওয়া ও রাস্তার দুর্দশার কারণে দাঁড়ানোও দায় হয়ে পড়ে। অন্ধকার আর বৃষ্টির মধ্যে গাছের ডালের আঘাত থেকে বাঁচতে মাথা নিচু করে কোনোমতে কিছুদূর যাওয়ার পর শুরু হয় নতুন বিপত্তি। নৌকার মাঝিরা কয়েকগুণ বেশি ভাড়া চাওয়ার পাশাপাশি পুরো পথ যেতেও অস্বীকৃতি জানায়। অগত্যা নিজেদের চিরচেনা রাস্তায় হেঁটেই বাড়ি ফেরার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন এই তরুণেরা।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির উচ্চতাও বাড়তে থাকে। মোবাইল ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে পিচঢালা পথ ধরে হাঁটা শুরু করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা রূপ নেয় এক অজানা আতঙ্কে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোথাও কবরস্থান, কোথাও মসজিদ আর ঘন গাছপালায় ঢাকা পথ। টানা বৃষ্টিতে চশমা ঘোলা হয়ে যাওয়ায় ১০-১২ ফুটের বেশি কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। রাস্তার ভাঙা ইট আর ভেঙে পড়া গাছের ডালের আঘাতে পা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল। এর মধ্যেই ছিল বানের পানিতে ভেসে আসা সাপের ভয়।

হাঁটু থেকে শুরু হওয়া পানি একসময় কোমর এবং বুক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এক অজানা শূন্যতায় যখন মনের জোর কমে আসছিল, তখন রাজপথের স্লোগান “আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবেই” তাদের বারবার উজ্জীবিত করেছে। যে পথটুকু পার হতে সাধারণ সময়ে মাত্র ১৫-২০ মিনিট লাগে, বুক সমান পানি আর স্রোতের প্রতিকূলে সেই পথ পাড়ি দিতে তাদের সময় লেগেছে টানা তিন ঘণ্টা। রাত সাড়ে ১০টার পর তারা যখন বাড়িতে পৌঁছান, তখন শরীরে একবিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না।

এই ভয়াল যাত্রাপথে শাখায়েত হোসেনের মনে বারবার একটি প্রশ্নই উঁকি দিচ্ছিল— নোয়াখালীর মূল শহরের এত কাছের একটি গ্রামে পৌঁছাতেই যদি এত বেগ পেতে হয়, তবে ফেনীর মতো যেসব জায়গায় ১২ ফুট পর্যন্ত পানি হয়েছে, সেখানে উদ্ধারকর্মীরা কীভাবে কাজ করছেন? দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা হাজারো স্বেচ্ছাসেবী, যাদের অনেকেই সাঁতার জানেন না, লাইফ জ্যাকেট ভরসা করে তারা স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নিজেদেরই বিপদে ফেলছেন না তো?

তবে সব শঙ্কা আর ক্লান্তির মাঝেও একটি বিষয় এই তরুণদের মনে গভীর আশার সঞ্চার করেছে। তা হলো— জাতীয় ঐক্য। বন্যার এই দুর্যোগে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে, মসজিদ ও বিত্তবানদের বাড়িগুলো যেভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, তা এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর মানুষের মাঝে যে দেশপ্রেম আর একতার জন্ম হয়েছে, তা যেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

ভয়াল বন্যা আর রাজপথের অভিজ্ঞতা থেকে এই তরুণদের একটাই প্রত্যাশা— দেশের মানুষের এই ইস্পাতকঠিন ঐক্য যেন বজায় থাকে। কারণ এই একতাই একদিন সত্যিকারের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলবে, যেখানে কোনো বিদেশি শক্তি আর কখনো আধিপত্য বিস্তারের সাহস পাবে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button