আইন-শৃঙ্খলা

শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের ভাগিনা আলভিন গ্রেফতার

মুহাম্মদ জুবাইর

চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে আত্মগোপনে থাকা কুখ্যাত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও আলোচিত হত্যা মামলার আসামি মোঃ আলভিন(৩১)কে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের ভাগিনা হিসেবে এলাকায় পরিচিত এবং তার বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।পুলিশের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসছিল।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ০৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৩০ মিনিটের দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চালিতাতলি খন্দকারপাড়া মসজিদে মাগরিবের নামাজ শেষে চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপির বর্তমান এমপির নেতাকর্মীরা এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেন। ওই সময় স্থানীয় নেতা সরোয়ার হোসেন সাকিব প্রঃ বাবলা উপস্থিত নেতা কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে লিফলেট বিতরণ করছিলেন এবং বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছিলেন।

গণসংযোগ কর্মসূচি চলাকালে সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে হঠাৎ করেই উপস্থিত হয় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঘটনাস্থলে এসে আচমকা হামলা চালায় এবং লক্ষ্য করে সরোয়ার হোসেন সাকিব প্রঃ বাবলাকে। এ সময় সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে পিছন দিক থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশের তদন্তে উঠে আসে যে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোঃ সাজ্জাদের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এই হামলা পরিচালিত হয়। তার নির্দেশে রায়হান(৩৫), মোবারক হোসেন ইমন(২২), বোরহান(২৭), আলাউদ্দিন(২৮), মোঃ হেলাল প্রঃ মাছ হেলাল(৩২), মোঃ নিজাম উদ্দিন প্রঃ হাবিব(৪০)সহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ১৬ জন সন্ত্রাসী সংঘবদ্ধভাবে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। তারা সংঘবদ্ধভাবে সরোয়ার হোসেন সাকিব প্রঃ বাবলাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হামলা চালায় এবং এলোপাতাড়ি গুলি করে তাকে হত্যা করে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা নং ০৯ তারিখ ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ধারা ১৪৩ ১৪৮ ১৪৯ ৩০২ ৩২৬ ৩০৭ ১০৯ ৩৪ পেনাল কোড ১৮৬০ এর আওতায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার পর থেকেই এজাহারভুক্ত আসামি এবং অজ্ঞাতনামা জড়িতদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ দফায় দফায় অভিযান পরিচালনা করে আসছিল। তবে ঘটনার পরপরই অনেক আসামি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যায়।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় পুলিশ তথ্য প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় অভিযুক্তদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখে। দীর্ঘদিন ধরে চলা নজরদারি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অবশেষে ১৪ মার্চ ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যার দিকে চান্দগাঁও থানাধীন পশ্চিম ফরিদা পাড়া এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশের একটি চৌকস টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে আলোচিত এই হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মোঃ আলভিনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত আলভিন দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ থানা এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি প্রকল্প ও উন্নয়নকাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করত সে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে হুমকি দেওয়া, মারধর করা কিংবা বিভিন্নভাবে হয়রানি করা ছিল তার নিয়মিত কৌশল।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আলভিন শুধু চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং নগরীর বিভিন্ন সহিংস ঘটনা, খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে সে একজন ভয়ংকর সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিল এবং তার নাম শুনলেই অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, এই আলভিন এমন কোনো অপরাধ নেই যা সে এই বয়সে করেনি। একাধিকবার গ্রেফতার হলেও সে কখনোই অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসেনি। বরং প্রতিবার জামিনে বের হয়ে আবারও আগের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করত। তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রের দাপটই তাদের পরিবারের মূল পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুদিন ধরে এলাকায় অস্ত্রের ঝনঝনানি আর ভয়ভীতির রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল তারা।

ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। সামান্য কথা কাটাকাটিতেও অস্ত্র বের করে ফেলা এবং কথার আগে গুলি চালানোই ছিল আলভিনের স্বভাব। ফলে এলাকার সাধারণ মানুষ সবসময় আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছিল।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারের পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে মোঃ আলভিনকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারের জন্যও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button