অনুসন্ধানঅপরাধএক্সক্লুসিভ

পতেঙ্গায় এইচ পাওয়ার লাইনে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাসে অন্তত ১২ লাখ টাকার আদায়,প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে অবৈধ পরিবহন,অভিযোগে যুবলীগ কর্মী কাউসার,নীরব প্রশাসন,ফোন ধরেননি সংশ্লিষ্টরাচট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় অবৈধ এইচ পাওয়ার যানবাহনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট,যা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই পরিচালিত হলেও কার্যত অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় টিকে আছে।সিমেন্ট ক্রসিং থেকে পতেঙ্গা সীবিচ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কপথে চলাচলকারী প্রায় ২০০টিরও বেশি এইচ পাওয়ার গাড়িকে ঘিরে প্রতি মাসে অন্তত ১২ লাখ টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষায়,এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ “ছায়া অর্থনীতি”।স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী চালক ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই লাইন নিয়ন্ত্রণ করছে।অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন যুবলীগের কর্মী মোঃ কাউসার,যিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই লাইন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত।চালকদের অভিযোগ,প্রতিটি গাড়ির জন্য মাসিক নির্ধারিত চাঁদা রয়েছে।কেউ সেই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাকে সড়কে গাড়ি চালাতে বাধা দেওয়া হয়, এমনকি শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।একজন চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দেই। টাকা না দিলে গাড়ি আটকানো হয়, রাস্তায় নামতেই দেয় না। এই সিস্টেম বহুদিন ধরে চলছে।”অভিযোগ রয়েছে, এই লাইন থেকে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, এই বিপুল অর্থ একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন করা হয়।অভিযোগ অনুযায়ী, কথিত কয়েকজন স্থানীয় নেতা নিয়মিত এই অর্থের ভাগ পেয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর, বাবু ইসলাম, তপন দে ও রিমনের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের কাছেও নিয়মিত অর্থ পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে উল্লিখিত কথিত নেতা জাহাঙ্গীর, বাবু ইসলাম, তপন দে ও রিমনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই এই প্রতিবেদকের ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।অন্যদিকে, পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।একইভাবে ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা টি আই সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এতে করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।স্থানীয়দের দাবি, এইচ পাওয়ার গাড়িগুলোর অধিকাংশই অবৈধভাবে চলাচল করছে। প্রায় ২০০টিরও বেশি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫টির মতো বৈধ পারমিট রয়েছে বলে জানা গেছে। অধিকাংশ চালকের নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স।ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে পতেঙ্গা সীবিচমুখী সড়কে পর্যটকদের চাপ বেশি থাকায় এই অবৈধ যানবাহন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। যানজট, বিশৃঙ্খলা এবং অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও তা কেবল লোক দেখানো। কোনো গাড়ি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয় না এবং চাঁদাবাজি কার্যক্রমও বন্ধ হয় না। বরং অভিযানের পর আবার আগের মতোই চলতে থাকে পুরো কার্যক্রম।এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শুধু চাঁদাবাজিই নয়, আরও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে একটি কাভার ভ্যান ছিনতাইয়ের ঘটনাতেও এই চক্রের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ৪০ লাখ টাকা।এছাড়াও পতেঙ্গা উপকূলীয় এলাকায় ট্রলার থেকে বালি, ইট ও লবণ খালাসের সময় প্রতিটি ট্রলার থেকে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু কথিত ভুয়া সাংবাদিক এই সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করছে। নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে তাদের মাধ্যমে এই চক্র তাদের অপকর্ম আড়াল করে রাখে। ফলে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ পায় না এবং অপরাধীরা থেকে যায় নিরাপদে।বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। তরুণদের একটি অংশ এই অবৈধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্থানীয়দের মতে, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই এই চক্র দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।এলাকাবাসী দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতেঅবৈধ এইচ পাওয়ার যানবাহন বন্ধ করতে হবেচাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবেজড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবেপ্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবেস্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা এলে খুব অল্প সময়েই এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button