অপরাধশিক্ষা

বিইউএফটি-তে অস্থিরতা: একাডেমিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনের গুরুতর অভিযোগে উত্তাল ক্যাম্পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার আদর্শ ও পবিত্রতা ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম, একাডেমিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক অবক্ষয়ের গুরুতর সব অভিযোগ সামনে আসছে। বিশেষ করে ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

একাডেমিক আক্রোশ ও বৈষম্যের অভিযোগ:

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের লেকচারার আফসানা মেহেরুন আইনি একাডেমিক ফলাফলকে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার অনুগত নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীকে তিনি অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করছেন। অন্যদিকে, মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেওয়া বা ফলাফল আটকে রেখে তাদের ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানান, একাডেমিক কোনো সমস্যা নিয়ে ডিন বরাবর লিখিত আবেদন করলে ওই শিক্ষিকা বিষয়টিকে ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সেমিস্টারগুলোতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক হেনস্তা ও নম্বর কর্তনের ‘শাস্তি’ কার্যকর করেন।

নৈতিক স্খলন ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবক্ষয়:

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি উঠেছে শিক্ষকতার মহান পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ছাত্রদের সাথে অস্বাভাবিক সখ্যতা নিয়ে। বিভিন্ন সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষিকা নির্দিষ্ট কিছু ছাত্রকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিলাসবহুল রিসোর্টে ভ্রমণে যান এবং সেই সব ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের নৈতিক সীমানা অতিক্রম করার এই বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাস জুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। এছাড়াও তার ব্যক্তিগত জীবন ও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত নানা বিতর্কও বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও রহস্যজনক নীরবতা:

এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন আলমগীর হোসেন ১৮ জন শিক্ষার্থীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার রফিকুজ্জামানের বক্তব্যে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন। রেজিস্ট্রারের এই রহস্যজনক অজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে—প্রশাসন কি তবে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে?

পুরানো ক্ষত ও গভীর সিন্ডিকেট:

বিইউএফটি-র এই অস্থিরতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, অতীতেও এক সাবেক ডিনের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে যারা গ্রেডের প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রীদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয়। অতীতে নিউমার্কেট এলাকায় এক শিক্ষার্থীর রহস্যজনক আত্মহননের পেছনেও এমন কোনো কারণ ছিল কি না, তা নিয়ে পুনরায় জোরালো দাবি উঠেছে। যদিও সেই তদন্ত পরবর্তী সময়ে আর আলোর মুখ দেখেনি।

পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ ও বর্তমান পরিস্থিতি:

কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ক্যান্টিনের খাবারের চড়া মূল্য ও নিম্নমান, মেয়েদের হোস্টেলের অত্যধিক ভাড়া এবং ল্যাব সরঞ্জামের চড়া দাম নিয়ে শিক্ষার্থীরা এর আগে ৭ দফা দাবিতে আন্দোলন করলেও তার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

বর্তমানে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের দাবি:

সচেতন অভিভাবক মহল ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, একাডেমিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনের উদাসীনতা বিইউএফটি-কে এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত করেছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উচ্চপর্যায়ের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এখন সময়ের দাবি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি তার গৌরব হারিয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হতে পারে।

বর্তমানে ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।

(চলবে…)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button