
হাবিব সরকার স্বাধীন: ঢাকা রাজধানীর বনানী কবরস্থান—যেখানে শেষ শয্যাটুকু নিশ্চিত করা সাধারণ মানুষের জন্য এক দুঃস্বপ্নের নাম। সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এখানে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হিসেবে নাম এসেছে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সেখানে ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা জসিমের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়মানুযায়ী মূল্য তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙানোর কথা থাকলেও সেখানে কোনো তালিকার চিহ্ন নেই।

বানরের ওপর দায় চাপিয়ে অদ্ভুত সাফাই সরকারি নির্ধারিত ফি-র তালিকা কেন নেই? এমন প্রশ্নের জবাবে জসিম যা বললেন, তা রীতিমতো হাস্যকর ও অবিশ্বাস্য। তিনি দাবি করেন, “১৫ দিন আগে বানর এসে সিটি কর্পোরেশনের সেই তালিকা ছিঁড়ে ফেলেছে।” জসিমের এমন দায়সারা এবং অদ্ভুত যুক্তি অনুসন্ধানী দলের মনে আরও সন্দেহের দানা বেঁধেছে। সচেতন মহলের মতে, সরকারি নথিপত্র বা তালিকা গায়েব করে দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এটি একটি পুরনো কৌশল মাত্র।
কবর নিয়ে চলছে ‘মধু’র ব্যবসা অভিযোগ রয়েছে, বনানী কবরস্থানে জায়গার কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে স্বজনহারা মানুষের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করছে একটি অসাধু চক্র। ১৬ বছর ধরে একই স্থানে খুঁটি গেড়ে বসা জসিম এই এলাকার প্রতিটি ইঞ্চি সম্পর্কে অবগত। প্রভাবশালী মহল এবং কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে এখানে চলে ‘কবর বেচাকেনা’।
অনুসন্ধানে উঠে আসা প্রধান অনিয়মসমূহ: * গোপনে কবর বিক্রি: স্থায়ী সংরক্ষণের জায়গা না থাকলেও মোটা অঙ্কের বিনিময়ে নতুন কবরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। ১৮-২৪ মাস পার হওয়ার আগেই পুরাতন কবরের ওপর নতুন দাফন করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
ফি নিয়ে কারসাজি: ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য সরকারি নির্দিষ্ট ফি থাকলেও ‘অতিরিক্ত সুবিধা’র নামে স্বজনদের কাছ থেকে কয়েক গুণ বেশি টাকা আদায় করা হয়।
ভুয়া বরাদ্দ পত্র: জালিয়াতির মাধ্যমে স্থায়ী কবরের মালিকানা দাবি করার ঘটনাও এখানে ওপেন সিক্রেট।
আজিমপুরেও সিন্ডিকেটের থাবা একই চিত্র দেখা যায় আজিমপুর কবরস্থানেও। সেখানে গোরখোদক ও দালালদের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেট শোকাতুর পরিবারগুলোকে জিম্মি করে বাঁশ, চাটাই এবং জায়গা নির্ধারণের নামে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার আগেই পুরাতন কবরের চিহ্ন মুছে ফেলে নতুন কাউকে দাফন করা হচ্ছে আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে।
শেষ ঠিকানা কি তবে বাণিজ্যের কেন্দ্র? মানুষ নামের এই সিন্ডিকেটগুলো ভুলে গেছে যে, দিনের শেষে প্রতিটি মানুষের গন্তব্য সেই সাড়ে তিন হাত মাটি। কবরের মূল্য তালিকার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার এই অমানবিক বাণিজ্য এখন তুঙ্গে।
প্রতিকার ও সতর্কতা: সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো দাফন বা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরাসরি আঞ্চলিক কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা এবং সরকারি রসিদ বুঝে নেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায়, বনানীর জসিমদের মতো ব্যক্তিদের ‘বানর কাহিনী’র কবলে পড়ে প্রতারিত হতে হবে সাধারণ মানুষকে।



