অভিযানআইন-শৃঙ্খলা

ইপিজেডে প্রকাশ্যে জুয়া খেলতে গিয়ে ৬ জন গ্রেপ্তার নগদ দেড় লাখের বেশি টাকা উদ্ধার

মুহাম্মদ জুবাইর

গভীর রাতে র‌্যাবের অভিযানে জুয়ার আসর ভাঙচুর বিপুল টাকা ও তাস জব্দ

চট্টগ্রাম মহানগরীর ইপিজেড থানা এলাকায় প্রকাশ্যে জুয়া খেলতে গিয়ে ৬ জন জুয়াড়িকে নগদ দেড় লাখ টাকারও বেশি অর্থসহ হাতেনাতে আটক করেছে র‌্যাব ৭ চট্টগ্রাম। শুক্রবার গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।এ সময় জুয়ার আসর থেকে ১৫৬টি তাস এবং নগদ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।পরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের ইপিজেড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব সূত্রে জানা যায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে ইপিজেড থানাধীন খেজুরতলা এলাকার একটি বসতঘরে কিছু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নগদ টাকার বিনিময়ে জুয়া খেলা পরিচালনা করে আসছে।এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করে র‌্যাব ৭ এর একটি আভিযানিক দল শুক্রবার ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখে আনুমানিক রাত ১টা ১৫ মিনিটে সেখানে অভিযান চালায়। র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল জনৈক সাইফুল নামের এক ব্যক্তির দোচালা টিনের ঘরে পৌঁছালে জুয়াড়িরা র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করে। তবে র‌্যাব সদস্যদের তৎপরতায় ঘটনাস্থল থেকেই ৬ জনকে আটক করা সম্ভব হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো মোঃ সুমন মিয়া বয়স ৩০ পিতা মৃত আহম্মদ আলী সাং বলাই শিমুল থানা কেন্দুয়া জেলা নেত্রকোনা মোঃ নুর উদ্দিন বয়স ৪৫ পিতা মৃত সালেহ জহুর সাং কাটঘর বাজার ধুমপাড়া থানা পতেঙ্গা জেলা চট্টগ্রাম মোঃ রাশেদ বয়স ৪৭ পিতা মৃত আব্দুস সোবহান সাং মনির নগর থানা বন্দর জেলা চট্টগ্রাম মোঃ জাহেদ হোসেন বয়স ৪০ পিতা মৃত খাইরুল আমীন সাং কাজীর গলি থানা ইপিজেড জেলা চট্টগ্রাম মোঃ হাসান বয়স ৩৬ পিতা মৃত ইসমাইল সাং ইছামতি আলী নগর থানা সাতকানিয়া জেলা চট্টগ্রাম এবং আরও এক জন মোঃ হাসান বয়স ৩৮ পিতা মৃত ফিরোজ আহম্মদ সাং পহঁরচাদা থানা চকরিয়া জেলা কক্সবাজার। জুয়ার আসর থেকে তাদের আটক করার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বাক্ষীদের সামনে তল্লাশি চালিয়ে নগদ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১৫৬টি তাস জব্দ করা হয়।

র‌্যাব ৭ জানায় আটককৃত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বসতঘরকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে জুয়া খেলার আয়োজন করে আসছিল। স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় তারা রাতের আঁধারে টাকা লেনদেনের মাধ্যমে এই জুয়ার আসর বসাতো।এতে করে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল সাধারণ মানুষ। অনেকেই পরিবার ধ্বংসের পথে ঠেলে দিত এই জুয়া খেলায় জড়িয়ে গিয়ে। বিষয়টি নজরে আসার পর র‌্যাব ৭ গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত সফল অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে জুয়ার এই আসর ভেঙে দেয়।

অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন জুয়া একটি সামাজিক ব্যাধি যা ব্যক্তি পরিবার এবং সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।বিশেষ করে নগদ টাকার লেনদেনভিত্তিক জুয়া মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। তাই র‌্যাব নিয়মিতভাবে এমন অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে।তারা আরও বলেন যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ থেকে জুয়া মাদক ও অন্য সব ধরনের অবৈধ কাজ নির্মূল না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত র‌্যাবের এই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।

অভিযানে জব্দ করা টাকা ও তাস আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সিলগালা করে রাখা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জুয়া আইনে মামলা দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ৬ জনকে এবং উদ্ধার করা আলামতসমূহকে ইপিজেড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি থানা পুলিশ দেখভাল করবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান এলাকায় কিছুদিন ধরেই গোপনে জুয়া খেলার অভিযোগ উঠছিল। তবে প্রমাণ না থাকায় অনেকেই প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছিলেন না। র‌্যাবের এই অভিযানের পর তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মনে করছেন এই ধরনের কঠোর তদারকি থাকলে ভবিষ্যতে আর কেউ এভাবে জুয়ার আসর বসাতে সাহস পাবে না।

র‌্যাব ৭ এর সহকারী পুলিশ সুপার এবং সহকারী পরিচালক মিডিয়া এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি জানান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে র‌্যাবের এই ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে চলবে।জনগণকে অপরাধ দমনে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন কেউ যদি কোনো অবৈধ কার্যক্রমের তথ্য পেয়ে থাকে তাহলে তা দ্রুত র‌্যাবকে জানাতে হবে।এতে করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সহজ হবে এবং সমাজে শান্তি নিরাপত্তা বজায় থাকবে।

চট্টগ্রাম নগরীতে এই ধরনের অভিযান নতুন কিছু নয়।এর আগেও র‌্যাব বিভিন্ন সময় ইপিজেড পতেঙ্গা বন্দর এবং অন্যান্য এলাকায় জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ধারাবাহিক তৎপরতায় নগরীর অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।তবে তারা মনে করছেন শুধু আইনগত ব্যবস্থা নিলেই চলবে না মানুষের মধ্যে নৈতিকতা এবং সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে যাতে তারা নিজেরাই এসব খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকে।

গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারা আইন অনুযায়ী সাজা পেতে পারেন। জুয়া আইন অনুযায়ী নগদ টাকার বিনিময়ে কার্ড বা অন্য কোনো খেলা পরিচালনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে এই মামলায় অভিযুক্তরা কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড এমনকি উভয় দণ্ডই পেতে পারেন। তবে আদালতই শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন।

চট্টগ্রাম নগরীকে অপরাধমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে র‌্যাব ৭ সহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে কাজ করছে তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে তারা প্রত্যাশা করছেন এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে অপরাধীরা সতর্ক হবে এবং সমাজ আরো নিরাপদ হবে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায় ইপিজেড এলাকায় প্রকাশ্যে জুয়া খেলার ঘটনায় ৬ জনের গ্রেপ্তার শুধুমাত্র একটি আইনগত ঘটনা নয় বরং এটি সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। অবৈধ কার্যক্রম যতই গোপনে হোক না কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে থাকা খুব কঠিন। তাই সমাজের প্রতিটি মানুষকেই আইন মেনে চলা এবং অন্যকে আইন মানতে উৎসাহিত করার মধ্য দিয়েই একটি সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button