সড়কজুড়ে অবৈধ গাড়ির রাজত্ব বৈধ চালকদের আহাজারি সংসারই আর চলে না

মুহাম্মদ জুবাইর
ট্রাফিক পুলিশের সামনেই চলছে অবৈধ অটোটেম্পু, পথে নামতে বাধ্য বৈধ চালকেরা
চট্টগ্রামে অবৈধ অটোটেম্পু চলাচল বন্ধ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত অটোটেম্পু শ্রমিকরা।শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে নগরীর প্রবেশদ্বারখ্যাত সিটি গেইট এলাকায় কয়েক শ অটোটেম্পু শ্রমিকের উপস্থিতিতে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।তাদের দাবি অবৈধভাবে সড়কে নামা অননুমোদিত অটোটেম্পুগুলো বৈধ গাড়িগুলোর জীবিকা কঠিন করে তুলেছে, অথচ প্রশাসন নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে আছে।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. খলিলুর রহমান,শ্রমিক নেতা মো. নাসিরসহ নগরীর অন্তত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটের বিপুলসংখ্যক অটোটেম্পু চালক।বিশেষ করে ১৩ নম্বর রুটের চালকেরা গণসমাবেশে সবচেয়ে বেশি অংশ নেন।তারা অভিযোগ করেন,এ রুটে বৈধ গাড়ির সংখ্যা মাত্র ১১৮টি হলেও বাস্তবে ২৫০টিরও বেশি অবৈধ গাড়ি অবাধে চলাচল করছে।অথচ ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনেই এগুলো চলছে;অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না।উল্টো বৈধ গাড়িগুলোকেই বেশি মামলা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী,পোর্ট কানেক্টিং সড়কসহ আশপাশের এলাকাতেই সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত অটোটেম্পুর সংখ্যা ১১৮টি।কিন্তু প্রতিদিন সেখানে চলে ৪ শতাধিক অবৈধ অটোটেম্পু।ফলে বৈধ গাড়ির চালকদের জীবনে নেমে এসেছে নীরব দুঃস্বপ্ন।যাত্রী কমেছে,আয়ের পরিমাণ কমেছে,অথচ খরচ বেড়েছে বহুগুণ।
একজন অভিজ্ঞ চালক আক্ষেপ করে বলেন,আমরা সারাদিন গাড়ি চালিয়ে ৫-৬০০ টাকা রোজগার করতে পারলেই ভাগ্য!কিন্তু গ্যাস,লোন,পরিবারের খরচ কিছুই আর মেটানো যায় না।অবৈধ গাড়ির চাপে সংসারই আর চলে না।আরেকজন চালক জানান,আগে একেকজন চালক দিনে অন্তত ২০–২৫ ট্রিপ দিতে পারতেন।এখন ট্রিপ কমে দাঁড়িয়েছে ৮/১০ এ।এতে দৈনিক আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।অথচ গাড়ির কিস্তি, গ্যারেজ ভাড়া, খরচ সব আগের মতোই আছে। ফলে অনেক চালক পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন,তারা কোনো অরাজকতা সৃষ্টি করতে চান না।বরং বৈধতার স্বীকৃতি রক্ষা এবং নিজের অধিকার নিশ্চিত করতেই রাজপথে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের বক্তব্য দেশে যখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে,তখন সড়কে কেন অবৈধ পরিবহন চলবে?
তারা আরও বলেন,প্রতিটি রুটে যেন কেবল বৈধভাবে নিবন্ধিত অটোটেম্পুগুলোই চলতে পারে,সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।প্রয়োজনে তালিকা তৈরি করে রুটভিত্তিক গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণের কথাও বলেন তারা।
বক্তারা অভিযোগ করেন,কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ গাড়ি সড়কে নামছে। এতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।তারা স্পষ্ট করে জানান এখন আর আগের মতো চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অবৈধতার সাথে সমঝোতা করা হবে না। শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
চালকদের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় বৈধ গাড়িকেই বেশি থামায়,বেশি মামলা দেয়। অন্যদিকে অবৈধ গাড়িগুলো যেন অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় নির্বিঘ্নে চলাচল করে। এতে বৈধ চালকরা চরম হতাশ, ক্ষুব্ধ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এক চালক বলেন আমরাতো লাইসেন্স,ট্যাক্স,সব নিয়ম মেনে চলি। তারপরও মামলা খাই। কিন্তু যাদের কোনো বৈধ কাগজ নেই, তারা দিব্যি গাড়ি চালায়। এটা কোন ন্যায়বিচার?
মানববন্ধনে বক্তারা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন রুটভিত্তিক বৈধ গাড়ির তালিকা প্রকাশ করতে হবেঅবৈধ গাড়ি শনাক্ত করে দ্রুত সড়ক থেকে অপসারণ করতে হবে,বৈধ গাড়ির প্রতি হয়রানি বন্ধ করতে হবে,সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে,তাদের দাবি সড়কে ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ নিশ্চিত করলেই কেবল চালকদের জীবন জীবিকা সুরক্ষিত হবে।
মানববন্ধন শেষে শ্রমিক নেতারা ঘোষণা দেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বৃহত্তর কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে। প্রয়োজনে রাস্তা অবরোধ ও লাগাতার আন্দোলনেরও ইঙ্গিত দেন তারা।তারা জোর দিয়ে বলেন আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সমাধান।কিন্তু জীবিকার প্রশ্নে আপস করব না।অবৈধ গাড়ি বন্ধ না হলে রাজপথে আরও বড় ধরনের আন্দোলন হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে,অবৈধ গাড়ি কর ও ফি দেয় না,ফলে বৈধ গাড়ির ওপরে আর্থিক চাপ বাড়ে
ট্রাফিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে,দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে
শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়
এ ছাড়া পরিবহন খাতে নৈরাজ্য বাড়লে সাধারণ যাত্রীও ঝুঁকিতে থাকে।
চালক ও শ্রমিকদের প্রস্তাব,রুটভিত্তিক বৈধ গাড়ির সংখ্যা নির্দিষ্ট করা,অবৈধ গাড়ি সড়ক থেকে সরানো
ট্রাফিক পুলিশের স্বচ্ছ তদারকি,হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা,শ্রমিক ইউনিয়নের সাথে নিয়মিত বৈঠকে
অটোটেম্পু চালকেরা বলেন,আমরা কেউ সংঘাতে চাই না। শুধু বৈধভাবে,সম্মানের সাথে কাজ করতে চাই। পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।
প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়,তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং পরিবহন খাত হবে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ এমনটাই আশা করেন তারা।



