চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামি তথ্য গোপন করে জামিনে মুক্ত এখন লাপাত্তা অভিযোগ!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার আসামি তথ্য গোপন করে জামিনে মুক্ত এখন লাপাত্তা অভিযোগ!১৪০ কোটি টাকার ঋণ,জাল পে-অর্ডার ও স্থগিত জামিন হৃদয় হত্যাকাণ্ডের আসামিকে খুঁজে পাচ্ছে না কেউ! চট্টগ্রামের আলোচিত জুলাই আন্দোলনে নিহত হৃদয় চন্দ্র তরুয়া (২৩) হত্যা মামলার আসামি হয়ে একাধিক সময় আদালতে হাজিরা ও জামিন নিলেও পরবর্তীতে তথ্য গোপন করে জামিনে মুক্ত হয়ে লাপাত্তা হওয়ার অভিযোগ উঠেছে জসিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।তাঁর বিরুদ্ধে শুধু এই হত্যা মামলাই নয়,ব্যাংক ঋণখেলাপি,জাল পে-অর্ডার জমা দেওয়া এবং আদালতের আদেশ অমান্য করার মতো অভিযোগও রয়েছে।জুলাই আন্দোলনের সময় নিহত হন হৃদয় চন্দ্র তরুয়া।এ ঘটনায় তাঁর বন্ধু মোহাম্মদ আজিজুল হক বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন।মামলাটি রুজু হয় মামলা নং-২৬, তারিখ ২০/০৯/২০২৪।

এ মামলায় অসংখ্য আসামির তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের কয়েকজনের নামও উঠে আসে।যার মধ্যে জসিম উদ্দিন নামটি একাধিকবার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানা ও পরিচয়ে ৬২ নম্বর আসামি জসীম উদ্দীন, পিতা মফজল আহমদ, সাং বদুর পাড়া, চন্দনাইশ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান।৭৪/১২৮ নম্বর আসামি জসীম উদ্দীন, পিতা নেয়াজুর রহমান, সাং খাগরিয়া ৫ নম্বর ওয়ার্ড,সাতকানিয়া,সাবেক খাগরিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি ও চন্দনাইশ গাছবাড়িয়া কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি। ৮২ নম্বর আসামি জসীম উদ্দীন, পিতা মরহুম আবদুল নবী, সাং উল্লাপাড়া, দোহাজারী পৌরসভা যুবলীগের সহ-সভাপতি।১৮৬ নম্বর আসামি জসিম উদ্দিন, পিতা সেকান্দর মিয়া, সাবেক কমিশনার ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন এসআই মোঃ আজহারুল ইসলাম, যিনি তখন চান্দগাঁও থানায় কর্মরত থাকলেও বর্তমানে কোতোয়ালী থানায় কর্মরত রয়েছেন।নিহতের পরিবার ও মামলার বাদীর পক্ষের দাবি, হত্যাকাণ্ডের গুরুতর মামলায় নাম থাকলেও আসামি জসিম উদ্দিন বিভিন্ন মামলার তথ্য গোপন করে আদালত থেকে জামিন নিতে সক্ষম হন। এরপর তিনি আর নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন না এবং তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। আইনজ্ঞদের মতে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিক মামলার তথ্য গোপন করে জামিন নেয়, তবে তা আদালতের সঙ্গে প্রতারণার শামিল এবং জামিন বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এদিকে উঠে এসেছে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জেসিকা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে জসিম উদ্দিন ২০১৬ সালে পদ্মা ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেন।শর্ত ছিল, এক বছরের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী আট বছর পার হলেও ঋণ পরিশোধ হয়নি। বরং ২০২২ সালে সম্পূর্ণ সুদ মওকুফের সুবিধা নিয়ে তিনি ঋণ পুনঃতফসিল করেন। এরপরও ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় পদ্মা ব্যাংক তাঁর বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। গত ৩০ এপ্রিল আদালত জসিম এবং তাঁর স্ত্রী তানজিনা সুলতানাকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
পরে ১০ জুলাই অর্থঋণ আদালত আবারও তাঁদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে জসিম উদ্দিন হাইকোর্টে গিয়ে জামিন ও স্থগিতাদেশ চান।সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি নাকি ১৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন এবং প্রমাণ হিসেবে পে-অর্ডারের ফটোকপি দাখিল করেন। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপিল করে জানায়,জমা দেওয়া পে-অর্ডার নকল বা জাল বলে সন্দেহ রয়েছে। বিষয়টি আদালতে উপস্থাপিত হলে হাইকোর্ট তাঁর জামিন স্থগিত করে নতুন নির্দেশ দেন।
এমন গুরুতর আর্থিক অপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি হত্যা মামলার আসামি হওয়া সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন চট্টগ্রামজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন,হত্যা মামলা, কোটি কোটি টাকার ঋণখেলাপি এবং আদালতে জাল কাগজ দাখিল এসব অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ।
তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে নিহত হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার পরিবার অভিযোগ করছে, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় মূল আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা দ্রুত বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তবে এখনো পর্যন্ত জসিম উদ্দিন বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, আদালতের নির্দেশনার আলোকে আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, উপরোক্ত সব তথ্য অভিযোগ ও মামলার নথির ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না এটাই আইনের নীতি।



