জুলাইযোদ্ধা সুরভী শিশু নাকি প্রাপ্তবয়স্ক?বয়স বাড়িয়ে রিমান্ড আবেদনে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বয়স ১৭ দেখানো হলো ২১ শিশু আইন উপেক্ষা করে সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
ব্ল্যাকমেইল, মামলা বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার আলোচিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।কিন্তু এ রিমান্ড আবেদন করতে গিয়ে তাকে ১৭ বছরের পরিবর্তে ২১ বছর বয়সী দেখানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে,সুরভীর জন্মসনদ অনুযায়ী তার জন্ম ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর।সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স ১৭ বছর ১ মাস ৭ দিন। অর্থাৎ শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী তিনি এখনো শিশু।ওই আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে,১৮ বছরের কম বয়সী শিশুকে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো বিধান নেই এবং সাধারণ জেলহাজতে রাখারও নিয়ম নেই।
তবে সুরভীর ক্ষেত্রে এসব আইন মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।জানা গেছে,২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় তাহরিমা জান্নাত সুরভীর নামে ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা করেন।এজাহারে তার বয়স উল্লেখ করা হয় ২০ বছর।কিন্তু পুলিশ একইদিন যে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী প্রস্তুত করে সেখানে তার বয়স ২১ বছর দেখানো হয়।এমনকি সেখানে তার পিতা,গ্রাম ও থানা ‘অজ্ঞাত’ উল্লেখ করা হলেও বয়সের ক্ষেত্রে বাড়তি নিশ্চয়তা দেখিয়েছে পুলিশ।
এই ঘটনায় আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন,একজনের পরিচয় অজ্ঞাত থাকতে পারে,কিন্তু জন্মসনদ না দেখে বয়স ১৭ বছর থেকে ২১ করা কি উদ্দেশ্যমূলক?তারা বলছেন,শিশু আইন অনুযায়ী শিশুকে রিমান্ডে নেওয়া যাবে না,তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই বয়স বাড়িয়ে দেখানো হয়ে থাকতে পারে।অন্যদিকে পুলিশ বলছে, এজাহারে বাদী যে বয়স উল্লেখ করেছেন পুলিশ সেটিই রেকর্ড করেছে।কালিয়াকৈর থানার ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন বলেছেন,আসামির বয়স ১৭ না ২১ সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আদালত ও তদন্তের। যদি তার বয়স কম হয়ে থাকে তাহলে আইন অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।তবে জন্মসনদ অনুযায়ী ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর জন্ম নেওয়া সুরভী বর্তমানে কলেজের ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের ছাত্রী এবং জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন বলেও জানা গেছে।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ২০১৮ সালে নিবন্ধিত ওই জন্মসনদ অনুযায়ীও তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক।এদিকে গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশ করা হয় যে, সুরভী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।কিন্তু মামলার এজাহারে চাঁদাবাজির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। ফলে মামলার নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের অমিল সৃষ্টি হয়েছে।সুরভীর আইনজীবী রাশেদ খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো জব্দ তালিকা নেই,অভিযোগপত্রও দাখিল হয়নি। তার দাবি,একজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া শিশু আইনের চরম লঙ্ঘন।বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ এর ৪ নম্বর ধারায় বলা আছে,অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী সবাই শিশু হিসেবে গণ্য হবে এবং শিশুর মাধ্যমে সংঘটিত যেকোনো অপরাধের বিচার হবে শিশু আদালতে।
একই আইনে বলা হয়েছে,শিশুকে রিমান্ডে নেওয়া যাবে না এবং সাধারণ জেলে রাখা যাবে না।২০১৬ সালে শিশু আদালতের এক আদেশেও বলা হয়েছিল,শিশুকে রিমান্ডে নেওয়ার সুযোগ নেই।কিন্তু তাহরিমা জান্নাত সুরভীর ক্ষেত্রে এই বিধান মানা হয়েছে কি না তা এখন আলোচনা সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।গ্রেপ্তারের পর থেকেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, যদি একজন ১৭ বছরের মেয়েকে কাগজে–কলমে ২১ বানানো যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও কতজন একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারে?এদিকে মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।সুরভীর বয়স যাচাই বাছাই এবং শিশু আইন প্রয়োগ করা হবে কি না তা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে একজনকে শিশু না প্রাপ্তবয়স্ক এই প্রশ্নকে ঘিরেই এখন তৈরি হয়েছে নতুন আইনি ও সামাজিক বিতর্ক।



