অগ্নিযুগের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন ৯২তম ফাঁসি দিবসে বিপ্লব ও আত্মত্যাগের অমর ইতিহাস

মুহাম্মদ জুবাইর
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবিভক্ত ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অগ্নিযুগের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন।১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি বিপ্লবী ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে ব্রিটিশ শাসকদের নির্মম ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মবলিদান দেন।আজ তাঁর ৯২তম ফাঁসি দিবস একটি দিন,যা শুধু শোকের নয়,বরং সাহস,আত্মত্যাগ ও আপসহীন দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণায় উজ্জ্বল।
এক সময় ব্রিটিশ আমলে একটি প্রবাদ চালু ছিল সূর্যসেনের ভারতবর্ষে সূর্য উদিত হয় না।এই প্রবাদ শুধু কথার কথা ছিল না; বরং তা ছিল ব্রিটিশ শাসকদের মনে গেঁথে থাকা এক আতঙ্কের প্রতীক।কারণ মাস্টারদা সূর্যসেন এমন এক বিপ্লবের নাম,যিনি অস্ত্র হাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।যিনি চট্টগ্রামকে তিন দিনের জন্য হলেও স্বাধীন করে দেখিয়েছিলেন,যিনি ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে পরীর পাহাড়ে বর্তমান চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীয়ন করেছিলেন।
মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানের প্রধান নায়ক।তাঁর নেতৃত্বে গঠিত বিপ্লবী দল ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার দখল করে নেয়,টেলিগ্রাফ ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে।এই ঘটনা শুধু চট্টগ্রাম নয়,পুরো ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।তিন দিনের জন্য হলেও চট্টগ্রাম ছিল ব্রিটিশ শাসনমুক্ত এ ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক সাহসী চ্যালেঞ্জ।
মাস্টারদা ছিলেন একজন শিক্ষক,কিন্তু তাঁর শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।তিনি শিখিয়েছিলেন আত্মমর্যাদা,দেশপ্রেম আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস।বিপ্লবী আনন্দ গুপ্ত তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন,মাস্টারদা তার অনুগামীদের শ্রদ্ধা অর্জন করতেন কোনো বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে নয়;তাঁর ভিতরে এমন এক স্বচ্ছ আন্তরিকতা ছিল,যা কর্মীদের মুগ্ধ করত।
এই আন্তরিকতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের এত কাছাকাছি এনে দিয়েছিল।
পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর মানুষের সঙ্গে মাস্টারদার সম্পর্ক ছিল গভীর ও আত্মিক।জালালাবাদ যুদ্ধের পর যখন ব্রিটিশ বাহিনীর দমন-পীড়ন চরমে পৌঁছায়,তখন এই গ্রামের সাধারণ মানুষই বিপ্লবীদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।পুলিশি ধরপাকড়ের ভয় উপেক্ষা করে তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে বিপ্লবীদের লুকিয়ে রেখেছিলেন।
আক্রান্ত অবস্থায় বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তীকে উদ্ধার করে সেবা-শুশ্রূষার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন হোসেন আলী। অন্যদিকে, ব্যাপক পুলিশি তল্লাশির সময় কামাল উদ্দিন নিজের বাড়ির বাঁধানো কবরের ভেতরে লুকিয়ে রাখেন মাস্টারদা সূর্যসেনকে।এই ঘটনা শুধু সাহসিকতার নয়, বরং হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত বিপ্লব ছিল কোনো একক সম্প্রদায়ের আন্দোলন নয়;এটি ছিল সকল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াই। তাঁর সঙ্গীরা ছিলেন বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক শ্রেণির মানুষ।সবাইকে একসূত্রে বেঁধেছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এই আপসহীন সংগ্রাম আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক শিক্ষা বহন করে।
অবশেষে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী মাস্টারদাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।তাঁর ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। ইতিহাস বলে,তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, যাতে তিনি তাঁর সাথীদের নাম প্রকাশ করেন। কিন্তু মৃত্যু মুখেও তিনি ছিলেন অবিচল। কোনো নাম বলেননি, কোনো আপস করেননি।১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যু ব্রিটিশদের জন্য সাময়িক স্বস্তি হলেও, সূর্যসেন হয়ে ওঠেন অমর।
আজ ৯২তম ফাঁসি দিবসে মাস্টারদা সূর্যসেন শুধু একজন বিপ্লবী নন,তিনি একটি আদর্শ,একটি চেতনা।তাঁর জীবন আমাদের শেখায় স্বাধীনতা কখনো দান হিসেবে আসে না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়।অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে সাহস ও ত্যাগ অপরিহার্য।
এই দিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় সেই অগ্নিপুরুষকে, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য।মাস্টারদা সূর্যসেনের আদর্শ আজও তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে ন্যায়,সাহস ও মানবিকতার পথে চলার জন্য।তাঁর রক্তে লেখা ইতিহাস কখনো মুছে যাবে না; কারণ সূর্যসেন মানেই সংগ্রাম,সূর্যসেন মানেই স্বাধীনতার দীপ্ত শিখা।



