ঢাকা থেকে আটক চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী বার্মা সাইফুল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম মহানগরীর অপরাধ জগতের আলোচিত নাম, সাবেক ছাত্রদল নেতা ও পুলিশের তালিকাভুক্ত শিষ্য সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলাম ওরফে বার্মা সাইফুলকে রাজধানী ঢাকা থেকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।সোমবার (১২ জানুয়ারি)দুপুরে ঢাকার গুলশান এলাকা থেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একটি বিশেষ টিম তাকে আটক করেছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
তবে এত বড় একটি ঘটনায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য না দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,দীর্ঘদিন ধরেই বার্মা সাইফুল চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি, খুলশী ,পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও আকবর শাহ থানা এলাকায় চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়,অবৈধ অস্ত্রের মহড়া,কিশোর গ্যাং পরিচালনা,অপহরণ,নির্যাতন, জিম্মি করে অর্থ আদায়,মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ ছিল তার মূল কার্যক্রম।নগর পুলিশের বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাকে ‘হাই রিস্ক ক্রিমিনাল’হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর জোনের উপ কমিশনার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।অপরদিকে নগর পুলিশের অন্য কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।তবে পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে,বার্মা সাইফুলকে ঢাকায় অবস্থানকালে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল এবং উপযুক্ত সময়েই তাকে আটক করা হয়।তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোথায় নেওয়া হয়েছে বা কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে,সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে,সাইফুলের পরিবার তার আটকের বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে।সাইফুলের ভাই ও ছাত্রদল নেতা মো:শাহীন বলেন,আমার ভাই চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিল।সেখানে ডিবির লোক পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি তাকে তুলে নিয়ে যায়।আমরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন পুলিশের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি,কিন্তু কেউই আটকের বিষয়টি স্বীকার করেননি।
তিনি দাবি করেন,রাজনৈতিক কারণে তার ভাইকে টার্গেট করা হচ্ছে।তার ভাষায়,আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আমার ভাই একটি পা হারিয়েছে।জুলাই আন্দোলনে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি।আজ সেই ত্যাগের প্রতিদান হিসেবে ভিত্তিহীন অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো।
বার্মা সাইফুলকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়।২০২১ সালের ১৬ জুন বায়েজিদ বোস্তামি থানা পুলিশের একটি টিম তাকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।পরে পুলিশ জানায়, বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় সাইফুল গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। ওই ঘটনা চট্টগ্রামে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনার পর ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সাইফুলের মা ছেনোয়ারা বেগম চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন।মামলায় অভিযোগ করা হয়,২০২১ সালের ১৬ জুন রাতে সাইফুল কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলে স্থানীয়ভাবে পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত শাহজাহান আকাশ তাকে জরুরি কথা আছে বলে ডেকে নেন।
একটি রেস্টুরেন্টে বসা অবস্থায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে জোরপূর্বক তুলে নেন।পরে একটি সাদা প্রাইভেটকারে তুলে তাকে নগরীর বিভিন্ন সড়কে ঘোরানো হয়।একপর্যায়ে গভীর রাতে বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় এনে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তৎকালীন সাবেক ওসি কামরুজ্জামান তার পায়ে গুলি করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
পরে গুরুতর আহত অবস্থায় সাইফুলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং একই সঙ্গে একটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।সেখানে চিকিৎসকরা তার বাম পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন।তবে ওই নালিশি মামলাটি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে ২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন নগর পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. শহীদুল ইসলাম।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী,বার্মা সাইফুল নগরীর পাহাড়তলী, খুলশী ,আকবর শাহ ও বায়েজিদ এলাকায় টেক্সটাইল মিল ও স্ক্র্যাপ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতেন।এসব এলাকার তুলা ও স্ক্র্যাপ ব্যবসার ওপর তার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।এছাড়া সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে প্লট তৈরি ও বিক্রি,দখলবাজি,অপহরণ,চাঁদাবাজি, পুলিশের ওপর হামলা,মাদকের আসর ও জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ৩৫টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
সর্বশেষ গত বছরের ১৮ নভেম্বর এক এস্কেভেটর ব্যবসায়ী হাসানের কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ ওঠে বার্মা সাইফুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তার অফিসে হামলা চালানো হয়।ভবনের সিসি ক্যামেরা ফুটেজে দেখা যায়,১০ থেকে ১২ জন সন্ত্রাসী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে,যাদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।এ ঘটনায় ওই ব্যবসায়ী বার্মা সাইফুলসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন,বার্মা সাইফুলের অধীনে নগরীতে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের দিয়ে অপহরণ,নির্যাতন,মারধর, জিম্মি করে টাকা আদায়,অস্ত্রের মহড়া,মোটরসাইকেল শোডাউন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়।দখলবাজি থেকে শুরু করে অপরাধ জগতের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তার প্রভাব নেই ,না বলেও দাবি করেন তারা।
সচেতন মহল মনে করেন,এই ধরনের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাগারে রাখা গেলে চট্টগ্রাম নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ধরনের সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। তাদের কঠোর শাস্তি না হলে নগরীতে কখনোই স্থায়ী শান্তি আসবে না।
সচেতন নাগরিকদের আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, বার্মা সাইফুলের সঙ্গে কিছু সোর্স ও ভুয়া সাংবাদিকের সখ্যতা রয়েছে।তাদের অভিযোগ,সাইফুলের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ হলে কিছু ভুয়া সাংবাদিক অর্থের বিনিময়ে পাল্টা সংবাদ প্রকাশ করে তাকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেন এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান।সচেতন নাগরিকরা বলছেন,অপরাধীদের পাশাপাশি এই ধরনের ভুয়া সাংবাদিকদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
ঢাকা থেকে বার্মা সাইফুল আটক হওয়ার খবরে চট্টগ্রাম নগরীতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।কেউ এটিকে অপরাধ দমনে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন,আবার কেউ পুলিশের নীরবতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। নগরবাসীর প্রত্যাশা,আলোচিত এই সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে এবার যেন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত হয় এবং কোনো প্রকার রহস্য বা বিতর্ক ছাড়াই দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্পন্ন করা হয়।



