বিজিবি’র ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ নিলো রেকর্ড ৩ হাজার নবীন সদস্য
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ইতিহাস গড়লো বিজিটিসিএন্ডসি
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হলো আজ।বিজিবি’র ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে রেকর্ড সংখ্যক ৩ হাজার ২৩ জন নবীন সদস্য দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব,অখণ্ডতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেছে।স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে একসঙ্গে এত সংখ্যক রিক্রুটের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠান এই প্রথম, যা বিজিবি ও দেশের সামরিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বুধবার সকালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাইতুল ইজ্জতে অবস্থিত বিজিবি’র ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার এন্ড কলেজ (বিজিটিসিএন্ডসি) এর ‘বীর উত্তম মজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে’ বর্ণাঢ্য এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নবীন সৈনিকদের শপথ গ্রহণ করান এবং প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বিজিটিসিএন্ডসি’র কমান্ড্যান্টসহ বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
সশস্ত্র সালামের মাধ্যমে শুরু ঐতিহাসিক কুচকাওয়াজ
সকালে মাননীয় স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টাকে নবীন সৈনিকদের পক্ষ থেকে সশস্ত্র সালাম প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর শৃঙ্খলাবদ্ধ ও তেজোদীপ্ত কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করে ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচের নবীন সৈনিকরা। কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ শেষে মাননীয় উপদেষ্টা নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন।
২৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তুলে ধরেন উপদেষ্টা
ভাষণে মাননীয় উপদেষ্টা বলেন,“২৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই বাহিনী কালের পরিক্রমায় আজ একটি সুসংগঠিত, চৌকস, সুশৃঙ্খল ও পেশাদার দেশপ্রেমিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে বিজিবি দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে দেশমাতৃকার অখণ্ডতা রক্ষা করছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি চোরাচালান রোধ, মাদক ও মানবপাচার প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিজিবি অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশবাসীর আস্থা অর্জন করেছে।
‘শৃঙ্খলাই সৈনিক জীবনের অলংকার’
নবীন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে মাননীয় উপদেষ্টা বলেন,“শৃঙ্খলা হচ্ছে সৈনিক জীবনের অলংকার। আদেশ ও কর্তব্য পালনে যে কখনো পিছপা হয় না, সেই প্রকৃত সৈনিক। সততা, বুদ্ধিমত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, আনুগত্য, তেজ ও উদ্দীপনা একটি বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতার মূল মাপকাঠি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নবীন সৈনিকরা এসব গুণাবলির প্রতিফলন ঘটিয়ে বিজিবি’র ঐতিহ্যকে আরও সমুন্নত রাখবে। বিজিবি’র চারটি মূলনীতি—মনোবল, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা এ উদ্বুদ্ধ হয়ে নবীন সদস্যদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালনের আহ্বান জানান তিনি।
শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারীদের সম্মাননা
মাননীয় উপদেষ্টা নবীন সৈনিকদের প্রদর্শিত তেজোদীপ্ত ও নান্দনিক কুচকাওয়াজের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাদের নতুন কর্মজীবনের শুভ সূচনায় আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
১০৪তম রিক্রুট ব্যাচে সর্ব বিষয়ে সেরা নবীন সৈনিক হিসেবে বক্ষ নং ১৫৫, রিক্রুট আল ইমরান প্রথম স্থান অর্জন করায় তাকে বিশেষভাবে মোবারকবাদ ও অভিনন্দন জানান।
এছাড়া,শারীরিক উৎকর্ষতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন বক্ষ নং ২৭৬৯ শপিকুল ইসলাম (পুরুষ) ও বক্ষ নং ১৫১৫ রিক্রুট লুবনা খাতুন (মহিলা),শ্রেষ্ঠ ফায়ারার হিসেবে নির্বাচিত হন বক্ষ নং ১৩৪৭ রিক্রুট শফিকুর রহমান তামিম (পুরুষ) ও বক্ষ নং ১৫৩১ রিক্রুট নাহিদা আক্তার (মহিলা)তাদের প্রত্যেককে মাননীয় উপদেষ্টা আলাদাভাবে অভিনন্দন জানান।,প্রশিক্ষণে ইতিহাস গড়লো বিজিটিসিএন্ডসি,মাননীয় উপদেষ্টা বলেন, বিজিটিসিএন্ডসি বিগত ৪৪ বছর ধরে বিজিবি’র রিক্রুটদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে গড়ে তুলছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭২টি ব্যাচকে সফলভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এই প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ৭০০ থেকে ১ হাজার জন হলেও ১০৪তম রিক্রুট ব্যাচে একসঙ্গে ৩ হাজার ২৩ জন (পুরুষ ২ হাজার ৯৫০ জন ও মহিলা ৭৩ জন) রিক্রুটকে মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনা ও বিজিবি সদর দপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে এই চ্যালেঞ্জিং প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
একসঙ্গে ৩ হাজারের বেশি রিক্রুটকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিজিটিসিএন্ডসি স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বলে উল্লেখ করেন মাননীয় উপদেষ্টা। সফল আয়োজন ও নান্দনিক কুচকাওয়াজের জন্য বিজিবি মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান তিনি।
ট্রিক ড্রিল ও ব্যান্ড ডিসপ্লেতে মুগ্ধ দর্শক
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে নবীন সৈনিকদের অংশগ্রহণে আকর্ষণীয় ট্রিক ড্রিল প্রদর্শিত হয়। এছাড়া বিজিবি’র সুসজ্জিত বাদকদলের মনোজ্ঞ ব্যান্ড ডিসপ্লে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
সবশেষে নবীন সৈনিকদের চৌকস দল কর্তৃক মাননীয় উপদেষ্টাকে সশস্ত্র সালাম প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিজিবি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সামরিক ও বেসামরিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



