আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রামনির্বাচনপ্রশাসনরাজনীতি

হলফনামায় ভয়াবহ জালিয়াতি মদ চোরাচালান মামলা গোপন দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ

মুহাম্মদ জুবাইর

কুমিল্লা ১০ আসনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়ন বাতিল নির্বাচন কমিশনের

কুমিল্লা ১০ নাঙ্গলকোট লালমাই সংসদীয় আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মো. আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচনী হলফনামায় গুরুতর তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।মদ চোরাচালান মামলায় আদালতে হাজির না হয়েও নিজেকে খালাসপ্রাপ্ত দেখানো দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অসঙ্গতি এবং একাধিক ফৌজদারি মামলার তথ্য গোপনের বিষয়টি সামনে আসার পর নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ও আদালত সূত্রে জানা যায় চট্টগ্রামের সিআরপি এলাকায় সুতা আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ চোরাচালানের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।মামলাটি দায়ের করেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাসুদ হাসান। মামলার নম্বর বন্দর থানা জিআর ১৫২। এ মামলায় আব্দুল গফুর ভূঁইয়া চার নম্বর এজাহারনামীয় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।

নির্বাচনী হলফনামায় আব্দুল গফুর ভূঁইয়া দাবি করেন তিনি উক্ত মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।কিন্তু চট্টগ্রাম মেজিস্ট্রেট কোর্টের নথি যাচাই করে দেখা যায় তিনি এ মামলায় কখনো আদালতে হাজির হননি এবং কোনো বিচারিক আদেশে তাকে খালাসও দেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম আদালতের জিআরও জানান তিনি কখনো কোর্টে হাজির হননি। মামলার নথিতে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহতি সংক্রান্ত কোনো বিচারকের স্বাক্ষর বা আদেশ নেই। তাহলে তিনি কীভাবে অব্যাহতি পেলেন সেটি রহস্যজনক।

এ ঘটনায় অপর প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরে আলম সিদ্দিকী নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা বাতিলের আবেদন করেন।তিনি বলেন বিচারিক ফয়সালা ছাড়া এবং আদালতে হাজির না হয়ে কেউ কীভাবে মামলায় অব্যাহতি পেতে পারে। এটি সরাসরি হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদান।তিনি মদ চোরাচালানসহ একাধিক মামলার তথ্য গোপন করেছেন যা নির্বাচনী আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ।

নথিপত্র অনুযায়ী ২৯ তারিখে স্বাক্ষরিত হলফনামায় আব্দুল গফুর ভূঁইয়া মামলায় অব্যাহতি পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।অথচ পরদিন ৩০ তারিখে কুমিল্লা ডিএসবি স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি এবং কোনো অব্যাহতি পাননি।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে থাকা জিআর ৮২ ৮ জিআর ১৩৮ ৮ এবং নাঙ্গলকোট থানার অস্ত্র আইনের মামলা নম্বর ০১ এই তিনটি মামলার তথ্যও তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেননি। যদিও ২০০৮ সালের হলফনামায় এসব মামলার তথ্য তিনি নিজেই উল্লেখ করেছিলেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে পূর্বে ঘোষিত মামলার তথ্য পরবর্তীতে গোপন করা ইচ্ছাকৃত প্রতারণার শামিল।

মদ চোরাচালান মামলার নথি অনুযায়ী আব্দুল গফুর ভূঁইয়া সহ মোট আটজন আসামি ১০০ প্যাকেট গার্মেন্টস ওরিয়েন্টেড ফেব্রিক আমদানির ঘোষণা দিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ চোরাই চালান করেন।যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকান হুইস্কি ৬০০ লিটার স্প্যানিশ হুইস্কি ১২০০ লিটার ইতালীয় ভদকা ১২০০ লিটার স্কটিশ হুইস্কি ৪৫০০ লিটার সাউথ আফ্রিকান রেড ওয়াইন ১০২৬ লিটার পর্তুগিজ রেড ওয়াইন ৪৫০ লিটার সুইডিশ ভদকা ১৮০০ লিটার এবং স্কটিশ ব্ল্যাক হুইস্কি ৯০০ লিটার। মোট মদের পরিমাণ ১১ হাজার ৬৭৬ লিটার।

স্থানীয় নাঙ্গলকোট ও লালমাই এলাকার বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান এই আসনের একটি বড় অংশ ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা। এমন একজন প্রার্থী নির্বাচিত হলে সীমান্ত অঞ্চলের মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা অঘোষিত সুরক্ষা পাবে। এতে পুরো এলাকা ভবিষ্যতে মাদক ও অস্ত্রের রেড জোনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি বায়রার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত আছেন বলে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করে ফোন কেটে দেন।

সব অভিযোগ আদালতের নথি ডিএসবি রিপোর্ট এবং আবেদন পর্যালোচনা শেষে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও মাদক মামলা গোপনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন কুমিল্লা ১০ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়ন বাতিল করে।

নির্বাচনী বিশ্লেষকরা বলছেন এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থা ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button