আইন-শৃঙ্খলাচট্টগ্রামরাজনীতি

অবস্থান নিষিদ্ধ সিএমপি’র নজিরবিহীন গণবিজ্ঞপ্তি নিয়ে নগরজুড়ে আলোচনা বিতর্ক

মুহাম্মদ জুবাইর

চট্টগ্রাম মহানগরীর এলাকায় ঢোকা ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে তিন শতাধিক অধীক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সিএমপি যা সংস্থাটির ইতিহাসে নজিরবিহীন একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।গত শনিবার এসব ব্যক্তির নাম ঠিকানা উল্লেখ করে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকায় চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিষয়টি নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রকাশিত তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায় সারাদেশের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সংখ্যাই বেশি যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ নাশকতা সহিংসতা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।

একই তালিকায় বিএনপির কয়েকজন নেতার নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন মাত্রার আলোচনা সৃষ্টি করেছে।এ ছাড়া কারাগারে বন্দি ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নাম তালিকাভুক্ত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নাগরিক মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

সিএমপি সূত্র জানায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।পুলিশ বলছে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা অতীতে বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সহিংসতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় প্রবেশ বা অবস্থান করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে এটি একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যার মাধ্যমে সহিংসতা নাশকতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আগেভাগেই ঠেকানো সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন এগুলো হচ্ছে সন্ত্রাসী।এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাসহ নানান ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমি চিন্তা করলাম এটা এমন একটা এক্সট্রা কাজ যেটা করে রাখলে ভালো।কমিশনারের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় নির্বাচনকেন্দ্রিক উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতেই পুলিশ অতিরিক্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই তালিকা প্রকাশ করেছে।সিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান নগরীতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

তবে এই পদক্ষেপ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে কোনো ব্যক্তিকে এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলছেন আদালতের আদেশ ছাড়া এভাবে নাম প্রকাশ করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে মৌলিক অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ে। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই তালিকা ব্যবহার হলে তা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।উল্লেখ্য এর আগে গত বছরের নভেম্বরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্রাশফায়ারের নির্দেশ সংক্রান্ত বক্তব্য দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ।সে সময়ও তার ভূমিকা নিয়ে দেশব্যাপী বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এবারের পদক্ষেপ নিয়েও সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক মহলের একটি বড় অংশ সিএমপির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।তারা বলছেন দীর্ঘদিন ধরে নগরীতে সন্ত্রাস চাঁদাবাজি রাজনৈতিক সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে পুলিশ একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে যে চট্টগ্রামে অপরাধের কোনো জায়গা থাকবে না। অনেকেই মনে করছেন এই তালিকা অপরাধীদের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে এবং নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হবে।

তবে একই সঙ্গে নগরবাসীর মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।যদি তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা সত্যিই সন্ত্রাসী হন এবং তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকে তাহলে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না কেন।শুধুমাত্র এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করা হলে জনগণের আস্থা আরও বাড়ত বলে মত দিচ্ছেন তারা।বিশ্লেষকদের মতে নির্বাচনকে সামনে রেখে সিএমপির এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ আইনি কাঠামো এবং স্বচ্ছতা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।তা না হলে এই গণবিজ্ঞপ্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিবর্তে নতুন বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button