জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের ওপর সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব এক র্যাব সদস্য নিহত তিনজন জিম্মি আতঙ্কে চট্টগ্রাম

মুহাম্মদ জুবাইর
সরকারি পাহাড় দখলের রক্তাক্ত সাম্রাজ্য সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এখন সন্ত্রাসীদের নিরাপদজোন প্রশাসন বারবার ব্যর্থ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছেন র্যাব ৭ চট্টগ্রামের সদস্যরা।একটি নিয়মিত অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় এক র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন।আহত ওই সদস্যকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে র্যাবের আরও তিনজন সদস্যকে জিম্মি করে রাখার খবর পাওয়া গেছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় অতিরিক্ত র্যাব পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সোমবার ১৯ জানুয়ারি বিকেলে এই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে।সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে জানা যায় জিম্মি থাকা র্যাব সদস্যদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান রয়েছে।পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় অভিযান পরিচালনায় বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব ও পুলিশ।
চট্টগ্রাম র্যাব ও চট্টগ্রাম পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। চট্টগ্রাম র্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান সোমবার বিকেলে পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি টিম জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি অভিযানে যায়।অভিযানের একপর্যায়ে সেখানে অবস্থানরত সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা র্যাব সদস্যদের ওপর হঠাৎ হামলা চালায়।চারদিক থেকে ঘিরে ধরে ককটেল বিস্ফোরণ ইট পাটকেল নিক্ষেপ এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করা হয়।এই হামলায় এক র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন।এ ছাড়া দুর্বৃত্তদের হাতে তিনজন র্যাব সদস্য জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন।আহত সদস্যকে দ্রুত উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.মহিনুল ইসলাম বলেন হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে।আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র্যাবের পাশাপাশি পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করছে।জঙ্গল সলিমপুর এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হলেও জিম্মি উদ্ধার ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
জানা গেছে সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকা গত প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে ওঠা বিশাল অবৈধ জনপদের নাম।এখানে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি রয়েছে।দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং ঘন জঙ্গল ঘেরা এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়খেকো ভূমিদস্যু কিশোর গ্যাং মাদক কারবারি জুয়া অস্ত্র ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।এলাকাটিতে বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ বলা চলে।সন্ত্রাসীদের নিজস্ব পাহারাদার বাহিনী রয়েছে যারা পাহাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী জঙ্গল সলিমপুর এখন একটি অঘোষিত সশস্ত্র দুর্গ।এখানে প্রশাসনের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।যখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসনের কোনো টিম এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করে তখনই পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি ককটেল ও ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালানো হয়।ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় তিন হাজার একশ একর।জেলা প্রশাসন সূত্র জানায় চট্টগ্রাম নগরের লিংক রোড সংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য বর্তমানে নয় থেকে দশ লাখ টাকা।সেই হিসেবে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা।এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ খুনোখুনি আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে। জমির নিয়ন্ত্রণ কে নেবে সেই প্রশ্নে প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে পাহাড়ে।
গত বছরের পাঁচ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে এলাকায়।সবগুলো হত্যাকাণ্ডের পেছনেই পাহাড় দখল ও আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে।সর্বশেষ ওই এলাকায় দুটি পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একজন নিহত হন।ঘটনার পরদিন সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুইজন সাংবাদিক।সেই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হলেও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এর আগেও একাধিকবার জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান ও পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদস্যসহ অন্তত বিশজন আহত হন।ওই ঘটনার পরও জঙ্গল সলিমপুরে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।২০২২ সালেও একাধিকবার র্যাব পুলিশ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।প্রতিবারই সন্ত্রাসীরা শক্ত অবস্থান ধরে রেখে প্রশাসনকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করলেই পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানরত পাহারাদারদের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা আগাম খবর পেয়ে যায়।মুহূর্তের মধ্যেই তারা পাহাড়ের চূড়া ও আড়াল থেকে গুলি ছোড়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে।ফলে বাহিনীর সদস্যদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।পর্যাপ্ত সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া সেখানে অভিযান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সরকারি খাস জমিতে কারাগার আইটি পার্কসহ অন্তত এগারোটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখার কথা ছিল।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জমি উদ্ধার না হওয়ায় কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সীতাকুণ্ড এবং আংশিক বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার জঙ্গল সলিমপুর আলিনগর ও বিভিন্ন ছিন্নমূল এলাকায় শত শত সশস্ত্র সন্ত্রাসীর বসবাস রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী এই সন্ত্রাসীরা এতটাই প্রভাবশালী যে প্রশাসন যখনই এলাকায় প্রবেশ করে তখনই তারা সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়।ফলে এলাকাটি ধীরে ধীরে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদজোনে পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসীদের জন্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান জঙ্গল সলিমপুরে আইন কার্যত সন্ত্রাসীদের হাতে বন্দি। রাতে অস্ত্রের মহড়া মাদকের আড্ডা জুয়া অপহরণ এবং চাঁদাবাজি নিত্যদিনের ঘটনা।কেউ প্রতিবাদ করলে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতন।সাধারণ মানুষ আতঙ্কে মুখ খুলতে সাহস পান না।
সর্বশেষ র্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে জঙ্গল সলিমপুরে আদৌ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আছে কি না।একটি এলাকা যেখানে বারবার র্যাব পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট এমনকি সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হন সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা ভয়াবহ অবস্থায় আছে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের দুর্গ ঘোষণা করে সেখানে বিশেষ সামরিক অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে খণ্ড খণ্ড অভিযানে কোনো লাভ হচ্ছে না। পুরো এলাকা ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
র্যাব পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।জিম্মি র্যাব সদস্যদের নিরাপদে উদ্ধার এবং হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।একই সঙ্গে অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের কথা ভাবা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্পর্শকাতর এলাকা।এখানে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং অপরাধী স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ফলে শুধু অভিযানের মাধ্যমে নয় বরং শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ছাড়া এই এলাকা থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করা কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই পাহাড়ি জনপদটি এখন যেন রাষ্ট্র বনাম সন্ত্রাসীদের এক নীরব যুদ্ধক্ষেত্র।সর্বশেষ র্যাবের ওপর হামলার ঘটনা সেই যুদ্ধকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।এখন দেখার বিষয় রাষ্ট্র কত দ্রুত এবং কতটা কঠোরভাবে জঙ্গল সলিমপুরে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। চট্টগ্রামের ভিতর আরেক চট্টগ্রাম যার নাম জঙ্গল সলিমপুর।।



