তদন্ত ছাড়াই অভিযুক্তদের বৈধতা: ইসির পক্ষপাতিত্ব ও রাষ্ট্রীয় সংকট

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক | বিশেষ প্রতিবেদক
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তি আইনের শাসন আজ প্রশ্নের মুখে। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রধান দায়িত্ব কেবল ভোট আয়োজন করা নয়, বরং নির্বাচনের পূর্বেই প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই ও আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর পক্ষপাতিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি না করেই তাদের বৈধতা প্রদানের বিষয়টি রাষ্ট্রকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক অবহেলা সংবিধান ও নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপি বা দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা তদন্ত সাপেক্ষে নিষ্পত্তি করা কমিশনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
কিন্তু কমিশনের বর্তমান কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। গুরুতর অভিযোগগুলো ‘মুলতবি’ বা ‘অমীমাংসিত’ রেখেই অভিযুক্তদের মনোনয়ন বহাল রাখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, বরং আইনের সচেতন উপেক্ষা। অভিযোগের সুরাহা না করে অভিযুক্তদের নির্বাচনী মাঠে ছেড়ে দেওয়া প্রকারান্তরে সংবিধানের বিধানকে অকার্যকর করার শামিল।
আস্থার সংকট ও দ্বিমুখী আচরণ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগে যখন সাধারণ কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়, অথচ প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অভিযুক্ত প্রার্থীরা সহজেই ছাড় পেয়ে যান—তখন কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া অনিবার্য।
এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি এখন রাজনৈতিক পক্ষের ‘রক্ষাকবচে’ পরিণত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ নাগরিকের জন্য আইন কঠোর, কিন্তু ক্ষমতাবানদের জন্য শিথিল—কমিশনের এমন বার্তা আইনের শাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
রাষ্ট্রের প্রতি চরম ধৃষ্টতা রাষ্ট্র মানে কেবল সরকার নয়; রাষ্ট্র মানে সংবিধান, বিচারব্যবস্থা ও নাগরিকদের সম্মিলিত অধিকার। তদন্ত ছাড়া অভিযুক্তদের বৈধতা দেওয়াকে রাষ্ট্রের প্রতি চরম ধৃষ্টতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত তিনটি নেতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে:
- সংবিধানের বিধানকে অকার্যকর করা।
- আইনশাসনের ভিত্তিকে নড়বড়ে করা।
- নির্বাচন কমিশনকে অভিযুক্তদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা।
কমিশন পুনর্গঠনের অপরিহার্যতা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পক্ষপাতদুষ্ট কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয় বলে জোরালো মত উঠে এসেছে। রাষ্ট্রকে এই সংকট থেকে মুক্ত করতে হলে এখনই কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে: ১. কমিশনের গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পুনর্মূল্যায়ন। ২. অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ কাঠামো তৈরি। ৩. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কমিশন পুনর্গঠন।
যদি নির্বাচন কমিশন অভিযুক্তদের দায়মুক্তির হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে নির্বাচন আর গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতা বৈধ করার নিছক আনুষ্ঠানিকতা। অবিশ্বাসের এই বাতাবরণ ও সাংবিধানিক সংকট কাটাতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, এর দায়ভার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।



