নির্বাচনরাজনীতি

জামায়াতের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নীরব সমর্থন’ ও কৌশলগত বাঁকবদল

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনের কূটনৈতিক ভাষা ও ইঙ্গিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে আর ‘অস্বস্তিকর বাস্তবতা’ হিসেবে দেখছে না, বরং দলটিকে একটি কার্যকর বিকল্প শক্তি হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন পোস্ট বাংলাদেশকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত পরীক্ষাগার হিসেবে উপস্থাপন করেছে। যেখানে জামায়াতকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেয়ে, ব্যবস্থার ভেতরে এনে ‘নিয়ন্ত্রিতভাবে’ ক্ষমতার অংশীদার করাই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল বলে মনে হচ্ছে।

ক্ষমতায়নের নতুন সমীকরণ প্রতিবেদনে সরাসরি ‘সমর্থন’ বা ‘সাপোর্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা না হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি ‘Exclusion fuels radicalism’ (বিয়োজন বা বাদ দেওয়া উগ্রবাদকে উসকে দেয়)—এই তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। অর্থাৎ, ইসলামপন্থি দলগুলোকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বাংলাদেশে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে কারা তা পূরণ করতে সক্ষম, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি বাস্তববাদী মূল্যায়ন দাঁড় করিয়েছে। এর মূল বার্তা হলো—জামায়াতকে উপেক্ষা না করে মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা।

‘নীরব সমর্থন’ ও কূটনৈতিক ভাষা পরিবর্তন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে একটি ‘পরিবেশ’ তৈরির কাজ করছে। একসময় জামায়াত প্রসঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বে ‘যুদ্ধাপরাধের উত্তরাধিকার’ (war crimes legacy) বা ‘উগ্রবাদী সংযোগ’ (extremist linkage)-এর মতো যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হতো, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তা প্রায় অনুপস্থিত। একে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের একটি বড় কৌশলগত সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া, প্রতিবেদনে বারবার ‘সকল প্রধান রাজনৈতিক শক্তির’ অংশগ্রহণে নির্বাচনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’-এর চাপ কার্যত জামায়াতের নির্বাচনি ও রাজনৈতিক বৈধতার পথই প্রশস্ত করছে।

মানবাধিকার বনাম ভূ-রাজনীতি ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, এই অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকানো এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার বা আদর্শিক প্রশ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিক এই সমীকরণে জামায়াতের আদর্শ নিয়ে আপত্তি থাকলেও, দলটিকে এখন ‘গ্রহণযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে মূলত তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে: ১. দলটির সুসংগঠিত ক্যাডার বাহিনী ও সামাজিক নেটওয়ার্ক। ২. দীর্ঘমেয়াদি বিরোধী রাজনীতিতে টিকে থাকার সক্ষমতা। ৩. ইসলামপন্থি হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহের পথে না গিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে থাকার কৌশল।

এই সক্ষমতাগুলোর কারণেই ওয়াশিংটন পোস্ট জামায়াতকে একটি ‘ম্যানেজেবল পলিটিক্যাল অ্যাক্টর’ (Manageable Political Actor) হিসেবে অভিহিত করেছে, যা কূটনৈতিক ভাষায় ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে গণ্য হয়।

অনালোচিত নৈতিক প্রশ্ন তবে এই কৌশলগত বাস্তবতার আড়ালে কিছু গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন উপেক্ষিত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব এবং সংখ্যালঘু ও নারীদের অধিকারের মতো বিষয়গুলো ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে প্রাধান্য পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা প্রমাণ করে যে, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়গুলোকে এখন ‘দ্বিতীয় সারির ঝুঁকি’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

সারমর্মে, ওয়াশিংটন পোস্টের এই বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে জামায়াতের ক্ষমতায়নকে এখন আর প্রতিরোধযোগ্য বিষয় হিসেবে দেখছে না। বরং জামায়াতকে ক্ষমতার বাইরে রাখার চেয়ে, নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ক্ষমতার অংশ করে নেওয়াই তাদের কাছে এখন বেশি লাভজনক কৌশল।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button