গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যা মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু, বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঐতিহাসিক অগ্রগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:– গাজীপুরে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
মামলার বাদী ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর জেলা স্টাফ রিপোর্টার, নিহত সাংবাদিক তুহিনের বড় ভাই সেলিমের সাক্ষ্যগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। চার্জ গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়াকে সাংবাদিক সমাজ বিচারিক ব্যবস্থার এক “ঐতিহাসিক মাইলফলক” হিসেবে দেখছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাংবাদিক হত্যা মামলার ইতিহাসে চার্জ গঠনের পর এত দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া বিরল, ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন ঘটনা। গত ৭ আগস্ট গাজীপুরের ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যার বর্বর ঘটনা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করে। সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারিক পরিণতির পথে এবার দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার, সহকর্মী ও সারাদেশের সাংবাদিক সমাজে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বুধবার দুপুরে প্রধান অভিযুক্ত কেটু মিজান ওরফে কোপা মিজান, তার স্ত্রী গোলাপিসহ মোট আটজন অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করেন। মামলার বাদী ও নিহত সাংবাদিকের বড় ভাই সেলিমের প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু একটি মামলার অগ্রগতি নয়; বরং সাংবাদিক হত্যা বিচারে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার একটি বড় পরীক্ষা।
সাংবাদিক তুহিনের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত চন্দ্র সরকার বলেন,“চার্জ গঠনের পর এত দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া সত্যিই ইতিবাচক। আমরা ইতোমধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের আবেদন করেছি। অনুমোদন পেলে পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই বিচার শেষ করা সম্ভব। তবে এখনো সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।”
দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের প্রধান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন,“গত ৫৪ বছরে দেশে ৬৯ জন সাংবাদিক নিহত হলেও অধিকাংশ হত্যার বিচার হয়নি, যা জাতির জন্য লজ্জাজনক। তুহিন হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হলে এটি একটি ব্যতিক্রমী নজির হয়ে থাকবে।”তিনি আরও বলেন,“দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিলে ৯০ দিনের মধ্যেই রায় সম্ভব। আমরা গত কয়েক মাস ধরে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়ে আসছি। আজ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছে—এই বিচার আমরা সত্যিই দেখতে যাচ্ছি।”
মামলার বাদী সেলিম বলেন,“দ্রুত বিচার চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করেছি। আজ দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ায় আমাদের পরিবারের জন্য এটি বড় স্বস্তির বিষয়। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।”সাংবাদিক নেতাদের অভিমত, এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজ কালো ব্যাজ ধারণ, মানববন্ধন, প্রেস ক্লাব কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবাদ গড়ে তোলে। একটাই স্লোগান তখন উচ্চারিত হয়—“তুহিন হত্যার বিচার চাই, দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুহিন শুধু একজন সাংবাদিকই ছিলেন না—তিনি ছিলেন সত্যের কণ্ঠস্বর। তার মৃত্যু ছিল সাংবাদিকতা, সমাজ ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। বিচার বিলম্বিত হলে সেই ক্ষত আরও গভীর হতো।চার্জ গঠন, দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে এই মামলার অগ্রগতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা আর ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।
সাংবাদিক মহলের দৃঢ় বিশ্বাস, তুহিন হত্যার বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন হলে এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি এবার সত্যিই প্রমাণ করবে, সত্যের কণ্ঠ কখনো রুদ্ধ করা যায় না?



