বেসরকারি কেজি স্কুলের বাণিজ্যিক বাস্তবতা: শিক্ষা নাকি প্রতারণা

শাহিন আহমেদ
ইদানীং শহর হোক কিংবা গ্রাম প্রায় প্রতিটি অলিগলিতেই গড়ে উঠছে অসংখ্য কেজি স্কুল ও নামসর্বস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাহ্যিক চাকচিক্য, বড় বড় প্রতিশ্রুতি আর মুখরোচক কথায় অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে এসব স্কুলে শিশুদের ভর্তি করানো হচ্ছে।
ভর্তির আগে বলা হয়,আমাদের স্কুলে লেখাপড়া ভালো ,রেজাল্ট অসাধারণ,শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও আচরণ প্রশংসনীয় ইত্যাদি , আশ্বাসের উপর ভর করে অভিভাবকরা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভর্তি করান।
কিন্তু ভর্তির পরই শুরু হয় ভিন্ন এক বাস্তবতা। একের পর এক বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া হয় অভিভাবকদের ওপর। স্কুল থেকেই খাতা কিনতে হবে, বই কিনতে হবে, ব্যাগ কিনতে হবে,চাইলে বাইরে থেকে কিছু আনার সুযোগ নেই। তার ওপর বিভিন্ন অনুষ্ঠান, দিবস, বার্ষিকী কিংবা অজুহাত দেখিয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকা আদায় করা হয়।অনেক ক্ষেত্রে এসবের কোনো স্বচ্ছ হিসাবও দেওয়া হয় না।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো,এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের আড়ালে শিক্ষার মান দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই যেখানে অর্থ আদায়ের ধান্দা শুরু হয়, সেখানে শিশুদের প্রকৃত শিক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে,সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শিশুদের শেখার কথা ছিল নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও জ্ঞান ,অথচ তারা প্রত্যক্ষ করছে কীভাবে ‘ভদ্রভাবে’ অর্থ আদায় করা যায়।
মাসের শেষে বেতন আদায়ের ক্ষেত্রেও দেখা যায় কঠোরতা, কখনো কখনো অমানবিক আচরণ। অথচ পাঠদানের মান, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ কিংবা শিশুর মানসিক বিকাশ এসব বিষয়ে নেই তেমন কোনো আন্তরিকতা বা জবাবদিহি।
দেশে যখন নানা খাতে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তখন এই বিষয়টি কেন বারবার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে সে প্রশ্ন জাগে। দেশের বড় বড় গণমাধ্যমকর্মী ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর কি এই বাস্তবতা চোখে পড়ে না, নাকি দেখেও না দেখার ভান করে চুপ করে থাকা হচ্ছে।
যদি এভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরটি বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়, তবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে, তারা কি শিক্ষা নিয়ে বড় হবে, নাকি শিখবে কীভাবে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে অন্যকে ঠকাতে হয়।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার দায় শুধু অভিভাবকদের নয়,এটি রাষ্ট্র, সমাজ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। এখনই যদি সচেতনতা ও কার্যকর নজরদারি না আসে, তবে ক্ষতিটা হবে অপূরণীয়,আর তার মাশুল দেবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।



