চর রসুলপুরের টঙ দোকান ও নদীজীবী মানুষের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ব্রহ্মপুত্র নদের চরগ্রাম রসুলপুরের খেয়াঘাট সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বালুচরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি টঙ দোকান যেন তারই প্রতিচ্ছবি। ছবি : সংগৃহীত
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা এই তিন নদীর বেষ্টনীতে দাঁড়িয়ে থাকা গাইবান্ধার চরাঞ্চল যেন বাংলাদেশের এক ভিন্ন ভূগোল। এখানে জীবন চলে নদীর স্রোতের মতোই কখনো শান্ত, কখনো অস্থির, আবার কখনো অনিশ্চয়তার ঢেউয়ে ভেঙে পড়ে মানুষের স্বপ্ন। এই চরের বুকেই গড়ে উঠেছে এমন কিছু ছোট্ট টঙ দোকান, যেগুলো শুধু ব্যবসার জায়গা নয় বরং হয়ে উঠেছে মানুষের মিলনমেলা, চিন্তা-চেতনার আড্ডাখানা আর দৈনন্দিন জীবনের গল্পের মঞ্চ।
ব্রহ্মপুত্র নদের চরগ্রাম রসুলপুরের খেয়াঘাট সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বালুচরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি টঙ দোকান যেন তারই প্রতিচ্ছবি। টিনের ছাউনি, বাঁশের খুঁটি আর কাঠের তাকজোড়া-এই ছোট্ট দোকানটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, নদীর বুকে গজিয়ে ওঠা কোনো অস্থায়ী আশ্রয়। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কেবল চা বিক্রির জায়গা নয় যেন এক জীবন্ত গল্পঘর, যেখানে প্রতিদিন জমে ওঠে চরজীবনের হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
এই টঙ দোকানের মালিক মো. মকবুল হোসেন। এই মানুষটি অল্প পুঁজি নিয়ে শুরু করেছিলেন তার ছোট্ট ব্যবসা। প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই দোকান খুলে বসেন তিনি। সকালে কৃষকেরা মাঠে যাওয়ার আগে এক কাপ চা খেয়ে যান, দুপুরে মাঝিরা নদী পাড়ি দিয়ে এসে বসেন বেঞ্চে আর বিকেলে জমে ওঠে গল্পের আসর।
দুপুর গড়িয়ে সাঁঝবেলা পর্যন্ত চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই টঙ দোকান ছিল এক রঙিন আড্ডার সাক্ষী। সংবাদ-প্রতিবেদনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলেছে হাসি-ঠাট্টা, স্মৃতিচারণ আর স্বপ্নের কথা। ধোঁয়া ওঠা লাল চায়ের কাপে যেন জমে উঠেছিল জীবনের অজস্র রঙ।
বেঞ্চে বসে ছিলেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ কৃষক, কেউ নৌকার মাঝি, কেউ’বা শহরফেরা ক্লান্ত চরবাসী। প্রত্যেকেই সঙ্গে করে এনেছেন নিজের জীবনের ছোট ছোট গল্প। এককাপ চায়ের সঙ্গে কেউ ভাগ করে নিলেন ছোটবেলার দুষ্টুমির স্মৃতি, কেউ বললেন মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রেমের কথা, আবার কেউ আলোচনা করলেন রাজনীতি, বাজারদরের ওঠানামা আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
বেলা তিনটার দিকে হঠাৎ মকবুল হোসেন দোকানের ভেতর রাখা ছোট্ট রেডিওটা চালু করলেন। ভেসে এলো ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা খবর। মুহূর্তেই আড্ডার শব্দ থেমে গেল। সবাই গভীর মনোযোগে শুনতে লাগলেন দেশের খবর, বিশ্বের খবর। চরজীবনের এই ছোট্ট কোণাটিও যেন তখন যুক্ত হয়ে গেল বিশ্বপরিসরের সঙ্গে।
চরাঞ্চলের টঙ দোকানগুলোর কাঠামো খুবই সাধারণ। জায়গার অভাবে ছোট্ট একটি ঘরের মতো করে বানানো হয় দোকানঘর। ভেতরে বড়জোর দুই থেকে তিনজন মানুষ দাঁড়াতে পারেন। দোকানের সামনের অংশে ক্রেতাদের বসার জন্য বাঁশের বেঞ্চ রাখা থাকে। অল্প জায়গা, অল্প পুঁজি-সবকিছুই সীমিত।
মকবুল হোসেন জানান, খুব কম পুঁজি নিয়ে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আয়ও খুব বেশি নয়। তবু এই দোকানই তার পরিবারের জীবিকার প্রধান ভরসা। চরের অনেক টঙ দোকানির অবস্থাও একই রকম— স্বল্প পুঁজি, স্বল্প লাভ, কিন্তু জীবনের জন্য অপরিহার্য একটি অবলম্বন।
টঙ দোকানের প্রধান পণ্য চা। চরাঞ্চলের কৃষক, নদীজীবী মানুষ, নানান পেশা ও বয়সের মানুষ এখানে এসে একত্রিত হন। চায়ের সঙ্গে বিক্রি হয় বিস্কুট, কেক, রুটি, কলা। ধূমপানের জন্য সিগারেটও থাকে। অনেকেই সকালে চা আর কেক খেয়ে নাস্তা সেরে নেন, আবার বিকেলে কলা-রুটি খেয়ে এক কাপ চা পান করে বাড়ি ফেরেন।
এই ছোট্ট দোকান তখন হয়ে ওঠে এক রমরমা গল্পের আসর। সন্ধ্যার পর রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশের সার্বিক অবস্থা সবকিছু নিয়েই আলোচনা হয় এখানে। কেউ বলেন, এই নদী বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরিকল্পিত খনন আর ভাঙনরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিলে আমাদের চরের মানুষের অনেক সুবিধা হতো। আরেকজন যোগ করেন, এইবার ভুট্টার ফলন ভালো হবেরে ভাই!” কেউ আবার স্বপ্ন দেখেন, “বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত নদীর ওপর একটা টানেল কিংবা ব্রিজ হলে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হতো।
চায়ের কাপ বদলায় হাত থেকে হাতে, আর সঙ্গে বদলায় আলোচনার সুর। কখনো হাসির খিলখিল, কখনো গম্ভীর স্বর। এই টঙ দোকান যেন হয়ে ওঠে এক খোলা সভাকক্ষ যেখানে কথা বলার জন্য কোনো মাইকের দরকার হয় না, প্রয়োজন শুধু একটি চায়ের কাপ আর কিছু আপন মানুষের উপস্থিতি।
সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে ঘাটে নৌকা ভিড়তেই একে একে সবাই উঠে পড়ে শহরের পথে। বেঞ্চগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। দোকান আবার নীরব। কিন্তু বাঁশের বেঞ্চ আর কাঠের তাকজোড়া যেন বয়ে নিয়ে যায় দিনের সব কথা, সব হাসি, সব স্বপ্নের গন্ধ।
চর রসুলপুরের এই টঙ দোকান শুধু একটি দোকান নয়, এটি গ্রামের আত্মা। এখানেই প্রতিদিন চায়ের কাপে বুদবুদের মতো উঠে আসে জীবনের আসল সৌন্দর্য। চা শেষ হয়, আড্ডা থামে, কিন্তু গল্প থেকে যায়। নদীর স্রোতের মতোই সেই গল্প বয়ে চলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে— চরের মানুষের জীবনগল্প হয়ে।



