জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্য হত্যা মামলার পলাতক আসামি গ্রেফতার

মুহাম্মদ জুবাইর
কক্সবাজারে র্যাব-৭ ও র্যাব-১৫ এর যৌথ অভিযানে ধরা পড়ল সাগর
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপের বর্বর হামলায় র্যাব সদস্য ডিএডি আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারনামীয় পলাতক আসামি আলীরাজ হাসান প্রকাশ সাগরকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।র্যাব-৭, চট্টগ্রাম ও র্যাব-১৫,কক্সবাজারের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ আভিযানিক দল কক্সবাজার সদর এলাকা থেকে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখ বিকেল আনুমানিক ৪টা ১৫ মিনিটে র্যাব-৭,চট্টগ্রামের একটি আভিযানিক দল চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অবস্থানরত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করে।ওই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড,চাঁদাবাজি,ভূমিদস্যুতা ও অবৈধ স্থাপনার জন্য কুখ্যাত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি।
অভিযান চলাকালে র্যাব সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন জড়ো করতে থাকে।অল্প সময়ের মধ্যেই আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন দুষ্কৃতিকারী দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা,ধারালো অস্ত্র ও ইট-পাটকেল নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত ও পরিকল্পিত হামলা চালায়।চারদিক থেকে ঘিরে ধরে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও মারধর শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।দুষ্কৃতিকারীদের হামলায় র্যাবের চারজন সদস্য গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন।আহতদের মধ্যে ডিএডি আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া ছিলেন সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে থানা পুলিশের সহযোগিতায় আহত র্যাব সদস্যদের উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ পাঠানো হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডিএডি মো. আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর তিনজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে চট্টগ্রাম সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দায়িত্ব পালনকালে র্যাব সদস্যের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর প্রকাশ্য হামলা ও সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত একজন কর্মকর্তাকে হত্যা করার ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।ঘটনাটি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এই ঘটনার পর র্যাব-৭,চট্টগ্রাম বাদী হয়ে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানায় একটি হত্যা ও সরকারি কাজে বাধাদান মামলা দায়ের করে।মামলায় ২৯ জনকে এজাহারনামীয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।মামলাটি সীতাকুণ্ড থানার মামলা নম্বর-২৪, তারিখ-২২ জানুয়ারি ২০২৬ ইং।এতে দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী ৩৫৩, ৩৩২, ২২৪, ২২৫, ৩৩৩, ৩০৭, ৩৮৬, ৩৬৪, ৩৪২, ৪২৭, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
মামলা দায়েরের পর থেকেই র্যাব-৭, চট্টগ্রাম পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়াতদন্ত জোরদার করে।বিভিন্ন সূত্র বিশ্লেষণ,প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব জানতে পারে যে, আলোচিত এই হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি আলীরাজ হাসান প্রকাশ সাগর কক্সবাজার জেলায় আত্মগোপনে রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ইং তারিখ রাত আনুমানিক ২টা ১০ মিনিটে র্যাব-৭, চট্টগ্রাম ও র্যাব-১৫, কক্সবাজারের একটি যৌথ আভিযানিক দল কক্সবাজার সদর থানাধীন সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।অভিযানে আলীরাজ হাসান প্রকাশ সাগর (২৮) কে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামি আলীরাজ হাসান প্রকাশ সাগর চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানাধীন ১০ নম্বর জঙ্গল সলিমপুর এলাকার বাসিন্দা।তার পিতা মৃত রহমত আলী। র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে এবং অন্যান্য আসামিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
র্যাব আরও জানায়,গ্রেফতারকৃত আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
র্যাব কর্তৃপক্ষ দৃঢ়ভাবে জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাকে হত্যা এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের মতো অপরাধ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে র্যাব সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
উল্লেখ্য,জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধচক্রের সক্রিয়তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। র্যাব সদস্য হত্যার এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।এ ঘটনায় জড়িত সকলকে দ্রুত গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো দাবি উঠেছে।



