
মুহাম্মদ জুবাইর
দেশের সবচেয়ে লাভজনক এনসিটি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার তোড়জোড়,বছরে ২ হাজার কোটি রাজস্ব হারানোর শঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বর্তমানে দেশের সবচেয়ে লাভজনক, কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত।পুরোদমে চালু হওয়ার পর থেকেই এটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।দেশীয় অপারেটরদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই টার্মিনালটি শুধু রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেই নয়,বরং দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
তবে এমন একটি লাভজনক ও কৌশলগত স্থাপনাকে জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ ঘিরে বন্দর সংশ্লিষ্ট মহল,ব্যবসায়ী সমাজ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্র বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে, বিপুল অঙ্কের ডলার বিদেশে চলে যাবে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।লাভের ধারাবাহিকতা ও রেকর্ড আয়।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে,এনসিটি চালুর পর থেকেই প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।গত বছর এই টার্মিনাল থেকে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট আয়ের একটি বড় অংশ। বর্তমানে বন্দরের মোট আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে এনসিটি থেকে।দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই টার্মিনালটি কার্যত বন্দরের ‘ক্যাশ কাউ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
জার্মান পরামর্শক হামবার্গ পোর্ট কনসালটেন্টসের নকশা অনুযায়ী এনসিটির প্রাথমিক ধারণক্ষমতা ছিল ১ দশমিক ১ মিলিয়ন টিইইউ (টুইেন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট)। কিন্তু দেশীয় শ্রমিক ও অপারেটরদের দক্ষতা,আধুনিক যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ফলে বর্তমানে এখানে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন টিইইউ পর্যন্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে।
এর ফলে আমদানি-রপ্তানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।২০০৭ সালে যেখানে একটি জাহাজকে বন্দরে অবস্থান করতে হতো ১০ থেকে ১২ দিন,সেখানে বর্তমানে সেই সময় কমে এসেছে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায়।গত বছরের অক্টোবর মাসে এনসিটিতে এক মাসে রেকর্ড ১ লাখ ২৩ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়, যা দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
এমন বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনসিটি হস্তান্তরের চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে অনেকেই ‘রহস্যজনক’ ও ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে দেখছেন।বন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ,যখন দেশ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত,তখন এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে গোপনে দরকষাকষি ও চুক্তির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তাদের মতে,এটি সরকারি পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ)নীতিমালা ও জাতীয় স্বার্থের সরাসরি লঙ্ঘন। কারণ অতীতে পিপিপি ভিত্তিতে এনসিটি পরিচালনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও তা বাতিল করা হয়েছিল। অথচ এখন কোনো স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টার্মিনাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী,এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে রাষ্ট্র বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বর্তমানে যে আয় সরাসরি সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে, তা বিদেশি অপারেটরের মুনাফা হিসেবে ডলারে পরিণত হয়ে বিদেশে চলে যাবে।
এতে শুধু রাজস্ব ক্ষতিই নয়,বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।একই সঙ্গে বন্দরের আর্থিক স্বনির্ভরতা নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিদেশি নির্ভরতা বাড়বে যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন অর্থনীতি ও বন্দর বিশেষজ্ঞরা।
এনসিটি শুধু একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়,এটি জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।টার্মিনালটির পাশেই রয়েছে নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি,কর্ণফুলী নদীর মোহনা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা।বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শ্রমিক নেতাদের মতে,একটি বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে এমন কৌশলগত স্থাপনা তুলে দেওয়া মানে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অংশ বেসরকারি ও বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়া।বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন,‘আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই এনসিটি অত্যন্ত দক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে।বন্দরের মোট আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে এই টার্মিনাল থেকে।এটি বিদেশিদের হাতে গেলে তারা ডলার নিয়ে যাবে, বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন,‘আমরা এরই মধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি।এরপরও যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়,তাহলে বন্দর অচল করে দেওয়ার মতো বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে যেতে বাধ্য হব।’
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য মো. জাফর আলম বলেন,‘চট্টগ্রাম বন্দরের মূল সংকট কেবল ব্যবস্থাপনা বা বিদেশি অপারেটর ইস্যু নয়।বড় সমস্যা হলো আধুনিক লজিস্টিক সিস্টেমের অভাব এবং শক্তিশালী পশ্চাৎ সংযোগের দুর্বলতা।
তার মতে,আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং গতি,পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম এবং ঢাকা চট্টগ্রাম করিডোরের সীমাবদ্ধতা বন্দরের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দিচ্ছে না।তিনি বলেন,‘যে কোনো চুক্তি হতে হবে স্বচ্ছ,কঠোর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণভিত্তিক এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে যাতে সত্যিকারের উইন-উইন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহম্মদ আমজাদ হোসেন চৌধুরী বলেন,‘বড় প্রকল্পে স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া মেনে দেশীয় কোম্পানিগুলোর অগ্রাধিকার থাকা উচিত।তারা সক্ষম না হলে তখন অন্যরা সুযোগ পাবে।কিন্তু এখানে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন,‘এনসিটি ইতোমধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে।এখানে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।বিদেশি বিনিয়োগ হলে তা নতুন, ভবিষ্যৎমুখী বন্দরে হওয়া উচিত।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান এবং পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



