র্যাব সদস্য হত্যাকারী কুখ্যাত মিজান সহ গ্রেফতার ২

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্য হত্যা,আলোচিত মামলার পলাতক আসামি মিজানসহ দুইজন গ্রেফতার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে নতুন মোড়
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বহুল আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্য হত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে।আলোচিত এই মামলার এজাহারনামীয় পলাতক আসামি মোঃ মিজান এবং তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৭, চট্টগ্রাম।পৃথক অভিযানে চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানায়,নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চলমান গোয়েন্দা তৎপরতা ও বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবেই এই গ্রেফতার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।গ্রেফতারকৃতদের ইতোমধ্যে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থার জন্য সীতাকুণ্ড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে একটি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে র্যাব-৭, চট্টগ্রাম। অভিযান চলাকালে হঠাৎ করে কতিপয় সশস্ত্র দুষ্কৃতিকারী অতর্কিতভাবে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।
হামলায় চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন। তাৎক্ষণিকভাবে অন্য সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)এ নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজন র্যাব সদস্যকে মৃত ঘোষণা করেন।
আহত অপর তিনজন সদস্য বর্তমানে চট্টগ্রাম সিএমএইচ-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা মুহূর্তেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হলে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরপরই র্যাব-৭, চট্টগ্রাম বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।মামলায় ২৯ জনকে এজাহারনামীয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী,মামলা নম্বর-২৪,তারিখ-২২ জানুয়ারি ২০২৬।মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী ৩৫৩, ৩৩২, ২২৪, ২২৫, ৩৩৩, ৩০৭, ৩৮৬, ৩৬৪, ৩৪২, ৪২৭, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।এসব ধারায় সরকারি কাজে বাধা,হামলা,হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, অপহরণ,বেআইনি আটক এবং হত্যা অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা মামলার ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে।
র্যাব-৭ জানায়,গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে,মামলার ১৬ নম্বর এজাহারনামীয় পলাতক আসামি মোঃ মিজান চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী থানা এলাকায় অবস্থান করছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৫টা ৫৫ মিনিটে র্যাব-৭-এর একটি অভিযানিক দল খুলশী থানাধীন ইস্পাহানি মোড় এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।অভিযানে মোঃ মিজান (৫৩) কে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত মিজানের পিতার নাম শাহজাহান মোল্লা, যিনি দেলোয়ার হোসেন নামেও পরিচিত।তার স্থায়ী ঠিকানা চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানাধীন নরুমপুর গ্রামে।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, মিজান দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলছিল। হত্যাকাণ্ডের পর সে অবস্থান পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় আশ্রয় নেয়।
এরপরদিন ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ ভোর আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে র্যাব-৭-এর আরেকটি অভিযানিক দল চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন বগুড়া নিবাস এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে মামলার সন্দেহভাজন পলাতক আসামি মোঃ মামুন (৩৮) কে গ্রেফতার করা হয়। মামুনের পিতার নাম মৃত বোরহান উদ্দিন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানাধীন কালাভানিয়া এলাকায়।
র্যাব জানায়,মামুন হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার নেপথ্যের আরও তথ্য উদঘাটনের আশা করছে আইনশৃঙ্ঙ্খলা বাহিনী।
গ্রেফতারকৃত উভয় আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তাদেরকে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের রিমান্ড আবেদনসহ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে।
র্যাব-৭-এর মিডিয়া শাখা জানায়, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধীদের গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনতে র্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) সহকারী পুলিশ সুপার এ. আর. এম. মোজাফ্ফর হোসেন বলেন,জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্য হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে আমাদের গোয়েন্দা ও অভিযানিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় র্যাব সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
এজাহারনামীয় পলাতক আসামি গ্রেফতারের খবরে স্থানীয় এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে তারা দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে মূল হোতাসহ সব জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে,এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বাহিনীর ওপর হামলা নয় এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলার ওপর সরাসরি আঘাত।ফলে মামলাটির দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক নিষ্পত্তি জরুরি।



