
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মাঘের কুয়াশা ভেদ করে যমুনার চরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে আখের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ। ক্ষেতের পাশেই চলছে আখ মাড়াই, কন্টেইনার ভরে সংগ্রহ করা হচ্ছে সোনালি রস আর বড় কড়াইয়ে জ্বাল দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে খাঁটি আখের গুড়। গ্রাম-বাংলার এই চিরচেনা দৃশ্য যেন এক জীবন্ত কর্মযজ্ঞ- যেখানে কৃষক, কারিগর, নারী-পুরুষ ও কিশোর-কিশোরীরা মিলেই বুনে চলেছেন জীবিকার গল্প।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চল- মুন্সিরহাট, বাঁশহাটা, পাখিমারা, হাসিলকান্দি, সাথালিয়া, হলদিয়া ও কানাইপাড়ায় এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। একদিকে আখ কাটা হচ্ছে, অন্যদিকে মেশিনের মাধ্যমে রস বের করে তা বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। কড়াইয়ের পাশে সজাগ দৃষ্টি কারিগরদের, ঘন হলেই নামিয়ে রাখা হয়, ২০-২৫ মিনিট পর শক্ত হয়ে ওঠে গুড়। তারপর হাতের ছোঁয়ায় নির্দিষ্ট আকারে গড়ে তোলা হয় পাটালি কিংবা মুঠো গুড়।
হাসিলকান্দি গ্রামের যমুনার চরে সরেজমিন দেখা যায়, আখ থেকে পাতা ও আগা আলাদা করছেন নারী-পুরুষরা। সেই অংশ নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে গৃহপালিত পশুর খাবার হিসেবে। কাটা আখ থেকে রস বের করে কন্টেইনারে ভরা হচ্ছে, এরপর শুরু হয় জ্বাল দেওয়ার পালা।
আখ মাড়াই কাজে নিয়োজিত আব্দুল লতিফ, মো. সোহরাব জানান, রস ঘন হয়ে এলে টিনের ড্রামে রাখা হয়। উত্তাপ কমে গেলে ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে জমাট বাঁধে গুড়। তরল গুড় বা ‘রশিও’ আলাদা সংরক্ষণ করে বাজারজাত করা হয়। নৌকার চরের কারিগর সুমন মণ্ডল ও মনির ইসলাম জানান, শীত মৌসুমজুড়ে আমরা এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে গুড় বানাই। আখ কাটা থেকে শুরু করে গুড় তৈরি- সব মিলিয়ে প্রায় চার মাস এখানে থাকতে হয়। প্রতিদিন ৩-৫ কড়াই গুড় তৈরি করি। কড়াই প্রতি ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা পারিশ্রমিক পাই। এই দিয়েই সংসার চলে।
আখচাষি মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘায় খরচ পড়ে ২৫-৩০ হাজার টাকা। গুড় বিক্রি করে লাভ থাকে ৪০-৫০ হাজার টাকা। তার ভাষায়, পাইকারিতে প্রতি কেজি গুড় ১০০-১২০ টাকা, খুচরায় ১৩০-১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। তিনি আরও বলেন, বন্যা সহনশীল হওয়ায় চরাঞ্চলে আখ চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ৭০০ গ্রাম ওজনের এক মুঠো গুড় ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভেজালমুক্ত গুড়ে ক্রেতার ভিড় বাজারে ভেজাল গুড়ের দাপটে অতিষ্ঠ ক্রেতারা সাঘাটার চরাঞ্চলে এসে স্বস্তি খুঁজে পান। গুড় কিনতে আসা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সাঘাটা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান স্থানীয় বাসিন্দা
আলতাফ হোসেন বলেন, চোখের সামনে খাঁটি গুড় তৈরি হতে দেখে কিনছি। এতে ভরসা পাই পরিচ্ছন্ন পরিবেশে গুড় বানানো হচ্ছে। ধোঁয়া ওঠা গুড় দেখে লোভ সামলানো যায় না। উৎপাদনের চিত্র: গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হাজার হেক্টর, বাস্তবে আবাদ হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার হেক্টর। জেলা কৃষি অফিসের আরেক তথ্যে জানা যায়, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে।
সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাজেরা খাতুন বলেন, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আখের চাষ হয়েছে। তবে চাষিদের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ না থাকায় আমরা মূলত পরামর্শ দিয়েই সহায়তা করি।
হাসিলকান্দির আখচাষি মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলো ভালো গেছে। আশা করছি এ মৌসুমেও গুড় আর পাটালি বিক্রি করে লাভ হবে। কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করায় আমাদের গুড়ের স্বাদ ও মান আলাদা। ন্যায্যমূল্যেই আমরা বিক্রি করি। শীতের কুয়াশা, ধোঁয়া ওঠা কড়াই আর মানুষের কর্মচাঞ্চল্য- সব মিলিয়ে সাঘাটার চরাঞ্চলের আখের গুড় শুধু একটি পণ্য নয়, এটি একেকটি পরিবারের জীবিকার গল্প। ভেজালমুক্ত, খাঁটি স্বাদের এই গুড় যেমন বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনছে, তেমনি চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।



