নজরুল ইনস্টিটিউটে রাতের পর্দা সরালেই বেরিয়ে আসে অন্ধকার অধ্যায়

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নজরুল ইনস্টিটিউটযেখানে শিশু-কিশোরদের নৃত্য,গান ও চিত্রকলার মাধ্যমে গড়ে ওঠার কথা,সেই প্রতিষ্ঠানই এখন ভয়ংকর প্রশ্নের মুখে।দিনের আলোয় শিশুদের মেধা বিকাশের পাঠশালা হলেও,রাত নামলেই সেখানে শুরু হয় এক অশুভ অধ্যায়।গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে উঠে এসেছে এমন সব দৃশ্য,যা শুধু সামাজিক নৈতিকতাকেই নয়,প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি নজরুল ইনস্টিটিউটে যোগ দেওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল-আমিন গত আট বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছেন এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে।পার্শ্ববর্তী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হওয়ায় কুমিল্লার একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ।
সরেজমিনে দেখা গেছে,নজরুল ইনস্টিটিউটের চারপাশে নেই কোনো আলোকসজ্জা,নেই সিসিটিভি ক্যামেরা। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়।এই অন্ধকারকে আশ্রয় করে সেখানে নিয়মিত আড্ডা জমায় কিশোর গ্যাং,বখাটে ও ছিনতাইকারীরা।ফলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।অথচ প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত এখানেই শিশুদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে। এরপর রাতের বেলায় এই প্রতিষ্ঠানে কী ঘটে সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
সংবাদকর্মীরা অনুসন্ধানে গিয়ে দেখতে পান,নৃত্য প্রশিক্ষণের একটি কক্ষে রাখা রয়েছে একটি ছোট বিছানা। কক্ষটি এতটাই সংকীর্ণ যে সেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।স্থানীয়দের ভাষ্য, গভীর রাতে ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়াম ভাড়া দিয়ে সেখানে আয়োজন করা হয় অশ্লীল নৃত্য,ভূরিভোজ এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ।বাইরে সিরিয়াল ধরে নারীদের দাঁড় করিয়ে মোটা অংকের অর্থ আদায় করা হয়। ভেতরে চলে ‘মনোরঞ্জনের’ নামে প্রকাশ্য নৈতিকতা ও আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল-আমিন নিজেই স্বীকার করেছেন,তিনি ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করেন। যদিও তাঁর দাবি,কেয়ারটেকার না থাকায় তিনি সেখানে থাকেন।তবে তথ্যানুসারে কেয়ারটেকার নিচতলায় অবস্থান করেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা কর্মস্থলে রাতযাপন করতে পারেন না,সেখানে তিনি বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে,তিনি অডিটোরিয়াম ভাড়া দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ উপার্জন করছেন,যার কোনো সরকারি হিসাব নেই।অথচ প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আলোকসজ্জা বাধ্যতামূলক,সেখানে নজরুল ইনস্টিটিউটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে এসবের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি প্রশাসনিক ব্যর্থতারই জ্বলন্ত উদাহরণ।
আল-আমিন দাবি করেন,তিনি বারবার ঢাকা অফিসে এ বিষয়ে আবেদন করেছেন। তবে এ সংক্রান্ত কোনো লিখিত প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।
এই পরিস্থিতিতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি উঠেছে আল-আমিনকে দ্রুত অপসারণ করে তাঁর যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত সব ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম তদন্তে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হোক।গোপন ভিডিও ফুটেজসহ একাধিক প্রমাণ ইতোমধ্যেই সংবাদকর্মীদের হাতে এসেছে,যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে আল-আমিন সবকিছু অস্বীকার করলেও প্রশ্ন থেকেই যায় যদি কিছুই লুকানোর না থাকে, তবে এত অন্ধকার কেন?কেন এই গোপনতা?
কবি নজরুল ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কলঙ্কিত হতে দেওয়া যায় না।এখনই সময় প্রশাসনের জেগে ওঠার হোক তদন্ত,হোক জবাবদিহি, আর ফিরে আসুক নজরুল ইনস্টিটিউটের হারানো মর্যাদা ও স্বচ্ছতা।



