অপরাধআইন-শৃঙ্খলাপ্রশাসন

পটিয়ার বিস্ফোরক মামলার ৪৩ নম্বর আসামি রাজু এক সময় বাঘ এখন আত্মগোপনে

মুহাম্মদ জুবাইর

শামসুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ রাজু শতকোটি টাকার টেন্ডার আর সহিংসতার নেপথ্যে যে নেটওয়ার্ক সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ রাজু শতকোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার মামলায় পটিয়াজুড়ে তোলপাড় পটিয়ার বিস্ফোরক মামলার ৪৩ নম্বর আসামি উৎপল সরকার রাজু,সহিংস রাজনীতি ও টেন্ডারবাজির নেপথ্যে প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অভিযোগ।

চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় আলোচিত বিস্ফোরক ও সহিংসতার মামলাটি নতুন করে তীব্র আলোচনায় এসেছে।এই মামলার এজাহারভুক্ত ৪৩ নম্বর আসামি উৎপল সরকার ওরফে রাজুকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতি প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত উৎপল সরকার রাজুর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেন্ডারবাজি অবৈধ অর্থ উপার্জন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয়দের মতে উৎপল সরকার রাজু ছিলেন পটিয়ার বিতর্কিত সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।রাজনৈতিক মহলে তাকে শামসুল হক চৌধুরীর ডান পকেটের লোক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।এই ঘনিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এজাহার সূত্রে জানা যায় উৎপল সরকার রাজু কচুয়াই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।গত প্রায় পনেরো বছর ধরে তিনি আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে জেলা পরিষদ এলজিইডি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।স্থানীয় ঠিকাদার ও রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি এসব টেন্ডার থেকে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা শতকোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন।

পটিয়া থানায় দায়েরকৃত বিস্ফোরক ও সহিংসতার মামলার নথি অনুযায়ী উৎপল সরকার রাজুকে ৪৩ নম্বর আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।মামলাটি দায়ের করেন মোহাম্মদ শাহাজান নামের এক ব্যক্তি যিনি বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন।এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন তার অনুপস্থিতিতে তার ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয় এবং হত্যাচেষ্টাও করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলন দমন করতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র ককটেল লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে এলাকায় দফায় দফায় হামলা চালায়।ঘটনার সময় ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়।রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।এই সহিংস ঘটনায় এক কিশোর গুরুতর আহত হয় এবং তার মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথাও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায় এই সহিংসতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাপট ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতার অংশ।এজাহার বিশ্লেষণে দেখা যায় মামলায় সাবেক চেয়ারম্যান সাবেক কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।এতে স্পষ্ট হয় এটি একটি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র।

উৎপল সরকার রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ কেবল সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী পটিয়ার সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সমন্বয়কারী দেবব্রত দাশ দেবুর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করত।দেবব্রত দাশ দেবু ছিলেন জেলা পরিষদের সদস্য।এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে উৎপল সরকার রাজু জেলা পরিষদের টেন্ডার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় উৎপল সরকার রাজু এলাকায় কার্যত অঘোষিত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতেন।তার অনুমতি ছাড়া কোনো ঠিকাদার টেন্ডার পেত না।কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে রাজনৈতিক মামলার ভয় দেখানো হতো।কিছু ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়ে নিম্নমানের নির্মাণকাজ করতেন উৎপল সরকার রাজু।এর ফলে সরকার বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছে।পটিয়ার বিভিন্ন সড়ক কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পায়নি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন যারা অবৈধ সুবিধা ভোগ করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ায় এখন একের পর এক গোপন তথ্য সামনে আসছে।উৎপল সরকার রাজুর নাম আলোচনায় আসার মূল কারণ টেন্ডারবাজির সঙ্গে সরাসরি সহিংস রাজনীতির যোগসূত্র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটিয়া থানার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায় মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।এজাহারে উল্লেখিত সকল আসামির ভূমিকা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সূত্র জানায় ইতোমধ্যে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

সংবাদের বিষয়ে উৎপল সরকার রাজুর পক্ষ থেকে বক্তব্য চাইলে তিনি কোন ধরনের বক্তব্য দেননি।

তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে করা মামলা।তবে স্থানীয়দের মতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিযোগ এবার আইনি নথিতে উঠে আসায় প্রকৃত সত্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন সহিংসতা টেন্ডারবাজি এবং রাজনৈতিক দাপটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে পটিয়ার রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।তারা প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক জানান এ রাজু একটা সময় কচুয়াই এলাকায় নিজেকে বাঘ বলে দাবি করতেন, তবে তিনি বর্তমানে ইঁদুরের মতো পটিয়া থেকে পালিয়ে চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালি থানা এলাকা সাবেরিয়া এলাকায় আত্মগোপনে আছেন।

স্থানীয়দের দাবি উৎপল সরকার রাজু বর্তমানে পটিয়া ছেড়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার সাবেরিয়া এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন।এক সময় এলাকায় বাঘের মতো দাপট দেখালেও বর্তমানে তিনি আতঙ্কে লুকিয়ে চলাফেরা করছেন বলে মন্তব্য করেন পটিয়ার একাধিক বাসিন্দা।

সব মিলিয়ে পটিয়ার বিস্ফোরক মামলার ৪৩ নম্বর আসামি উৎপল সরকার রাজু এখন পুরো এলাকার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।সহিংস রাজনীতি ও অবৈধ অর্থনীতির যোগসূত্রের যে অভিযোগ উঠেছে তা শুধু একজন ব্যক্তিকে নয় বরং দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।উল্লেখ্য উক্ত বিস্ফোরক মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১৮০ জন এবং অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে আরও আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ জন।তদন্তের অগ্রগতির দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো পটিয়া অঞ্চল।

( ধারাবাহিক প্রথম পর্ব)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button