
মুহাম্মদ জুবাইর
গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে পটিয়ার রাজু
শতকোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার মামলায় তোলপাড়,সাবেক হুইপের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত নিজেকে এক সময় পটিয়ার বাঘ পরিচয় দেওয়া এই রাজু এখন ইঁদুরের মত পালিয়ে বেড়াচ্ছেন
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় আলোচিত বিস্ফোরক ও সহিংসতার একটি মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত ৪৩ নম্বর আসামি উৎপল সরকার ওরফে রাজু যিনি স্থানীয়ভাবে পটিয়ার রাজু নামে পরিচিত এখন পুরো এলাকার আলোচনার কেন্দ্রে। অভিযোগ রয়েছে,গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি পটিয়া ছেড়ে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের দাবি,উৎপল সরকার রাজু ছিলেন পটিয়ার বিতর্কিত সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন।অনেকেই তাকে সাবেক হুইপের ‘ডান পকেটের লোক’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।এই ঘনিষ্ঠতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন এলাকায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পটিয়া থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক ও সহিংসতার মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়,উৎপল সরকার রাজুকে মামলার ৪৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।মামলাটি দায়ের করেন মোহাম্মদ শাহাজান নামের এক ব্যক্তি,যিনি বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন।এজাহারে উল্লেখ করা হয়,তার অনুপস্থিতিতে তার ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয় এবং হত্যাচেষ্টাও করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে এলাকায় দফায় দফায় হামলা চালায়।
ওই সময় ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়, রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।এ ঘটনায় এক কিশোর গুরুতর আহত হয় এবং তার মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথাও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
টেন্ডারবাজি ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের অভিযোগ
এজাহার ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়,উৎপল সরকার রাজু কচুয়াই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।অভিযোগ রয়েছে,গত প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে জেলা পরিষদ,এলজিইডি,সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।
স্থানীয় ঠিকাদার ও রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, এসব টেন্ডার থেকে তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা শতকোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন।অভিযোগ অনুযায়ী, পটিয়ার সাবেক হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সমন্বয়কারী দেবব্রত দাশ দেবুর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট কাজ করত, যার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন উৎপল সরকার রাজু।
একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় উৎপল সরকার রাজু এলাকায় কার্যত অঘোষিত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতেন। তার অনুমতি ছাড়া কোনো ঠিকাদার টেন্ডার পেত না। কেউ প্রতিবাদ করলে রাজনৈতিক মামলা ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়ে নিম্নমানের নির্মাণকাজ করা হতো।এতে সরকার যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে,তেমনি সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ভোগান্তিতে ছিল।পটিয়ার বিভিন্ন সড়ক,কালভার্ট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজের মান নিয়ে অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পাননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটিয়া থানার একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়,বিস্ফোরক মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। এজাহারে উল্লেখিত সকল আসামির ভূমিকা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সূত্র জানায়,মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক আসামিকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আমাদের প্রতিবেদক একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও উৎপল সরকার রাজু কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।তবে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে করা মামলা।
স্থানীয়দের দাবি,উৎপল সরকার রাজু বর্তমানে পটিয়া ছেড়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার সাবেরিয়া এলাকায় আত্মগোপনে রয়েছেন।এক সময় এলাকায় ‘বাঘের মতো’ দাপট দেখালেও এখন তিনি আতঙ্কে লুকিয়ে চলাফেরা করছেন এমন মন্তব্য করেন একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা।
সব মিলিয়ে বিস্ফোরক মামলার এই আসামিকে ঘিরে সহিংস রাজনীতি ও টেন্ডারবাজির যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তিকে নয় দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। উল্লেখ্য,ওই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১৮০ জন, পাশাপাশি ৬০/৭০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে। তদন্তের অগ্রগতির দিকে এখন তাকিয়ে আছে পুরো পটিয়া অঞ্চল।এই রাজু মামলা থেকে বাঁচতে বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানা এলাকার ছাবেরিয়ায় বসবাস করছেন
(অনুসন্ধানের ধারাবাহিক ২য় পর্ব)



