অন্যান্য

সাংবাদিক হওয়া এখন এতটাই সহজ নাকি ভয়ংকর রকমের সস্তা?

মুহাম্মদ জুবাইর

একটা সময় ছিল,সাংবাদিক পরিচয় মানেই ছিল সম্মান, দায়িত্ব আর সাহসের প্রতীক।সমাজের অন্যায়,দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরাই ছিল সাংবাদিকতার মূল শক্তি।কিন্তু আজ বাস্তবতা এতটাই নির্মম যে প্রশ্ন জাগে সাংবাদিক হওয়া কি আদৌ কোনো যোগ্যতার বিষয়,নাকি এখন এটা শুধুই টাকার খেলা?

আজকাল কিছু পত্রিকা,অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও নামসর্বস্ব আইপি টিভি সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে যাচাই-বাছাই ছাড়াই সাংবাদিক পরিচয়ের আইডি কার্ড সরবরাহ করছে।কোনো প্রশিক্ষণ নেই,নেই নৈতিকতা যাচাই,নেই পূর্ববর্তী পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ডের মূল্যায়ন।শুধু টাকা দিলেই মিলছে “সাংবাদিক” তকমা।এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে একদল কার্ডধারী সাংবাদিক যাদের হাতে কলম নয়,হাতে থাকে ভয় দেখানোর অস্ত্র।

এর ভয়াবহ পরিণতি প্রতিনিয়ত সমাজে দেখা যাচ্ছে। প্রায়ই শোনা যায় কোনো অপকর্মের অভিযোগে আটক ব্যক্তির পকেট থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রেস কার্ড।কখনো চাঁদাবাজি,কখনো মাদক ব্যবসা,কখনো ভূমি দখল কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়“সাংবাদিক”।এতে করে কেবল একজন ব্যক্তি নয়, গোটা সাংবাদিক সমাজ একযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বিশেষ করে মফস্বল এলাকাগুলোতে এই চিত্র আরও ভয়ংকর।শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এখন সাংবাদিক পরিচয়ে অবাধ বিচরণ করছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।চোর-বাটপার,অটোচালক,মাদক কারবারি, পতিতার দালাল এমনকি পেশাদার অপরাধীর কাছেও আজ প্রেস কার্ড পাওয়া যায়।প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা নানা অপকর্ম চালিয়ে যায়।আর বিপদে পড়লেই “আমি সাংবাদিক”এই একটি বাক্য উচ্চারণ করে পার পাওয়ার অপচেষ্টা করে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়,পুলিশের হাতে আটক হওয়া এসব কথিত সাংবাদিকদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা বা অস্তিত্বহীন অনলাইন মিডিয়ার প্রেস কার্ড।যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো নিয়মিত প্রকাশনা নেই, নেই অফিস, নেই দায়িত্বশীল সম্পাদক তবুও তারা সাংবাদিক বানিয়ে যাচ্ছে নির্লজ্জভাবে।

এই ভুয়া সাংবাদিকদের অপকর্মের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন প্রকৃত সাংবাদিকরা।মাঠে কাজ করতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তোলে “আপনিও কি ওই রকম?”এই এক প্রশ্নই একজন সৎ সাংবাদিকের বহু বছরের শ্রম,সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো সাংবাদিকতার কাঠামোগত শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়া। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জেলা প্রতিনিধি,উপজেলা প্রতিনিধি, স্টাফ রিপোর্টার,বিশেষ প্রতিনিধি এই পদগুলো নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও সীমারেখার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে,কেউ বিশেষ প্রতিনিধি পরিচয়ে পুরো জেলা ঘুরে বেড়াচ্ছেন,আবার কেউ স্টাফ রিপোর্টার পরিচয়ে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন তাও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিকে অবহিত না করেই।

ফলে একদিকে যেমন প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংবাদ সংগ্রহের গুণগত মান। দায়িত্বের সীমা না মানা,সমন্বয়ের অভাব ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকতা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।প্রশ্ন ওঠে যেখানে নিজের দায়িত্বই পরিষ্কার নয়,সেখানে জাতির সামনে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা সম্ভব?

এখানে আরও একটি গুরুতর বিষয় হলো আইপি টিভি ও অনলাইন মিডিয়ার অবাধ বিস্তার।কোনো নীতিমালা না মেনেই একের পর এক আইপি টিভি গড়ে উঠছে।যাদের বেশিরভাগেরই নেই নিবন্ধন,নেই সম্পাদকীয় নীতি,নেই জবাবদিহিতা।অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক পরিচয়ে মাঠে নামছে বহু মানুষ,যারা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির ধারেকাছেও যায়নি।

এই অবস্থা চলতে থাকলে সাংবাদিকতা নামের এই মহান পেশা খুব দ্রুতই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।তখন সমাজের চোখে সাংবাদিক মানেই হবে সন্দেহজনক একজন ব্যক্তি। যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

এখনই সময় কঠোরভাবে এই অনিয়ম বন্ধ করার।প্রেস কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একটি শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।

নইলে একদিন মানুষ প্রশ্ন করবে সাংবাদিক কারা?যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়,নাকি যারা শুধু একটি কার্ড ব্যবহার করে অপরাধ ঢেকে রাখে?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button