অন্যান্যঅপরাধঅভিযানআইন-শৃঙ্খলা

শিশু দেখাশোনার নামে নরকযন্ত্রণা,উত্তরা থেকে নির্যাতিত কন্যাশিশু উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর অভিজাত এলাকা উত্তরা। উঁচু দালান, সুশৃঙ্খল সড়ক, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই এলাকারই একটি বাসার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল এমন এক পাশবিক নির্যাতন, যা সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। শিশু দেখাশোনার আশ্বাসে দরিদ্র মায়ের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে। এরপর শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিভীষিকা। আগুনে গরম খুন্তি দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা,অকারণে মারধর, ভয়ভীতি ও বন্দি করে রাখার মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠে এসেছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে, যখন গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে তার মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরদিন উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হয় মামলা। এরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে দম্পতিসহ চারজনকে গ্রেফতার করে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটির মা একজন হোটেল কর্মচারী। স্বামীহারা এই নারী চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। এই সুযোগকে পুঁজি করেই অভিযুক্তরা এগিয়ে আসে। উত্তরা পশ্চিম থানাধীন একটি বাসায় কর্মরত সিকিউরিটি গার্ডের মাধ্যমে বাদীর সঙ্গে অভিযুক্ত দম্পতির পরিচয় হয়।

অভিযুক্তরা জানায়, তাদের বাসায় একটি শিশু দেখাশোনার জন্য একজন মেয়ের প্রয়োজন। তারা শিশুটির খাবার, পড়াশোনা, চিকিৎসা এমনকি ভবিষ্যতে বিবাহের যাবতীয় খরচ বহনের আশ্বাস দেয়। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের কারণে মা রাজি হয়ে যান তার একমাত্র কন্যা মোহনাকে (১১) তাদের কাছে রেখে দিতে।

২০২৫ সালের জুন মাসের শেষ দিকে শিশুটিকে অভিযুক্তদের বাসায় নিয়ে যান তিনি। শুরুতে নিয়মিত মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারলেও কিছুদিন পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে।

বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তিনি সর্বশেষ মেয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা করেছিলেন। এরপর থেকে অভিযুক্তরা নানা অজুহাতে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি। কখনো অসুস্থ, কখনো বাইরে, আবার কখনো বাসায় নেই—এই বলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হতো।
একপর্যায়ে ফোনেও যোগাযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়। মেয়ের খোঁজ নিতে গেলে মা অপমানিত ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হন।

৩১ জানুয়ারি ২০২৬ দুপুর ১টা ১০ মিনিটে অভিযুক্ত গৃহকর্ত্রী বিথী মোবাইল ফোনে বাদীকে জানান, তার মেয়ে অসুস্থ। দ্রুত এসে নিয়ে যেতে বলেন। খবর পেয়ে বাদী দুপুর ২টার দিকে অভিযুক্তদের বাসায় পৌঁছান। তবে তাকে বাসায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়, গৃহকর্ত্রী বাইরে আছেন, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে শিশুটিকে নিচে এনে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তখনই প্রকাশ পায় ভয়াবহ বাস্তবতা।

মেয়েকে কোলে নিয়েই মা দেখতে পান তার দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ক্ষতচিহ্ন।কোথাও পোড়া দাগ, কোথাও ফোলা, কোথাও রক্তজমাট বাঁধা। শিশুটি ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিল না। চোখেমুখে আতঙ্ক আর যন্ত্রণার ছাপ।

মা যখন কারণ জানতে চান, অভিযুক্তরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। পরে আত্মীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি তার মাকে জানায়, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বরের পর থেকে অভিযুক্ত দম্পতি এবং তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন সময় তাকে মারধর করেছে। শুধু মারধর নয়, খুন্তি আগুনে গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে।

কখনো খাবার বন্ধ রাখা, কখনো ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হতো। কাউকে কিছু বললে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো বলেও জানায় শিশুটি।

ঘটনার বিষয়ে পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে আলোচনা শেষে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০২৫) এর ৪(২)(খ)/৩০ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার পরদিন ২ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে পুলিশ উত্তরা এলাকার একটি বাসা থেকে চারজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন

১. বিথী (৪০) ২. শফিকুর রহমান সাফিকুর রহমান (৫৫) ৩. রুপালী খাতুন (৩৫) ৪. সুফিয়া বেগম (৫৫)

তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামীরা ভিন্ন ভিন্ন ও অসংলগ্ন তথ্য দিয়েছে। তাদের সঠিক পরিচয় যাচাই করাও সম্ভব হয়নি। তদন্ত চলাকালে জামিনে মুক্তি পেলে তারা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে পারে এবং মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে পুলিশ আসামিদের জামিনের ঘোর বিরোধিতা করে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেল হাজতে আটক রাখার আবেদন জানায়।

গ্রেফতারকৃত আসামী রুপালী খাতুনের দুইটি দুগ্ধপোষ্য সন্তান রয়েছে,একজন দুই বছর বয়সী, অন্যজন মাত্র ছয় মাসের। অভিভাবক না থাকায় আইন অনুযায়ী শিশু দুটিকে মায়ের সঙ্গেই আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

চার আসামীকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। আদালত মামলার কাগজপত্র গ্রহণ করে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। শিশুটির চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এই ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, শিশু শ্রম ও গৃহস্থালি কাজে শিশু ব্যবহারের নামে নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন,শুধু আইন প্রয়োগ নয়,সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার না করলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button