দুর্নীতি

১৬ গ্রেডের চাকরি, থাকেন ৩ কোটির ডুপ্লেক্সে: আলফাডাঙ্গার পেশকার বিল্লালের ‘আলাদিনের চেরাগ’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর: সরকারি চাকরিতে তিনি ১৬ গ্রেডের একজন সাধারণ কর্মচারী। স্কেল অনুযায়ী সর্বসাকুল্যে বেতন পান ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। অথচ গ্রামের বাড়িতে তাঁর রয়েছে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি। চাকরির বয়সসীমা পার করে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ, দলিল প্রতি ঘুষ বাণিজ্য এবং স্থানীয়ভাবে ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ—সব মিলিয়ে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পেশকার শেখ বিল্লাল যেন হাতে পেয়েছেন এক ‘আলাদিনের চেরাগ’।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন অনিয়মের পাহাড়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শেখ বিল্লালের ইশারা ছাড়া আলফাডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো দলিল নড়ে না।
আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পদ ও ‘কোহিনুর মঞ্জিল’ শেখ বিল্লালের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বিলমামুদপুর নতুনডাঙ্গি এলাকায়। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘কোহিনুর মঞ্জিল’ নামের এক আলিশান ডুপ্লেক্স ভবন। স্থানীয়দের দাবি, নিজের ৬ কাঠা জমির পাশাপাশি সরকারি ২ কাঠা জমি দখল করে তিনি এই বাড়ি নির্মাণ করেছেন, যার আনুমানিক ব্যয় ৩ কোটি টাকারও বেশি।
ব্যাংক থেকে ৮৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ি করেছেন বলে দাবি করেন বিল্লাল। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ২৫ হাজার টাকা বেতনের একজন ৩য় শ্রেণির কর্মচারী কীভাবে এত বড় অংকের ব্যাংক ঋণ পান? স্থানীয়রা জানান, মাত্র ৪-৫ বছর আগেও যার সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, চাকরি পাওয়ার পর হঠাৎ করেই তিনি অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন।
নিয়োগে ভয়াবহ জালিয়াতি: ৪৫ বছরে সরকারি চাকরি! সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ (মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩২) বছর। অথচ অনুসন্ধানে জানা যায়, শেখ বিল্লাল চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ৪৫ বছর বয়সে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক খলিফার প্রভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি প্রথমে অফিস পিয়ন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতি নিয়ে পেশকার হন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। স্থানীয় ময়েজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করা বিল্লাল কীভাবে এই পদে বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল: ৪% কমিশন বাণিজ্য আলফাডাঙ্গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম শেখ বিল্লাল। অভিযোগ রয়েছে, দলিলের মোট মূল্যের ৪ শতাংশ ঘুষ না দিলে তিনি কোনো কাজ করেন না। দলিল রেজিস্ট্রেশন, তল্লাশি কিংবা নকল উত্তোলন—প্রতিটি ধাপেই দিতে হয় উৎকোচ। টাকা দিলে রাতেও অফিস খোলা থাকে, আর না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়।
এসব অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে নাহিয়ান ইমন নামের এক ভুক্তভোগী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ফরিদপুর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
পারিবারিক ত্রাস ও রাজনৈতিক দাপট স্থানীয়দের অভিযোগ, পটপরিবর্তনের পরও বিল্লালের দাপট কমেনি। তাঁর বড় ছেলে সাইফুল এলাকায় ‘ত্রাস’ হিসেবে পরিচিত। বাবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে সাইফুল চড়াও হন, এমনকি হুমকি-ধমকি দেন। বিল্লালের ছোট ছেলে সাকিবও বেপরোয়া জীবনযাপন করেন। দামি গাড়ি, পোশাক ও মুঠোফোন ব্যবহার করে তাঁরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযুক্তের দম্ভোক্তি অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন শেখ বিল্লাল। দম্ভোক্তি করে তিনি বলেন, “নিউজ-টিউজ হলে আমার কিছু যায় আসে না। সাময়িক একটু ঝামেলা হবে, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।” অভিযোগ রয়েছে, কিছু নামধারী সাংবাদিককে মাসিক মাসোহারা দিয়ে তিনি ম্যানেজ করে রেখেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আলফাডাঙ্গা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার তনু রায় এবং ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ শরিফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁরা রিসিভ করেননি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button