উচ্চমান সহকারী হয়েও ‘সহকারী পরিচালকের’ দাপট: আবাসনে রাব্বি আলমের শত কোটি টাকার সিন্ডিকেট

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের তিনি কেবল একজন উচ্চমান সহকারী। অথচ চলনে-বলনে তিনি যেন দপ্তরের হর্তাকর্তা! অফিসের বাইরে নিজেকে পরিচয় দেন ‘সহকারী পরিচালক’ হিসেবে। বাসা বরাদ্দের ফাইল আটকে বা দ্রুত ছাড়িয়ে দেওয়ার নামে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য। অভিযুক্ত এই কর্মচারীর নাম মো. রাব্বি আলম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। নামে-বেনামে গড়েছেন ফ্ল্যাট, গাড়ি ও স্বর্ণালঙ্কারের পাহাড়, যা তাঁর আয়ের সঙ্গে চরমভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ।
বেতন সামান্য, সম্পদ পাহাড়সম একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর বেতন কাঠামো অনুযায়ী যা কল্পনা করাও অসম্ভব, রাব্বি আলম বাস্তবে ঠিক তাই করে দেখিয়েছেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তাঁর অঢেল সম্পদের চিত্র:
বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারা এবং বাসাবোতে রয়েছে তাঁর নিজস্ব দুটি ফ্ল্যাট। এছাড়া মতিঝিল এলাকায় আরও একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ চলছে।
গাড়ি ও স্বর্ণ: তাঁর মালিকানাধীন দুটি মাইক্রোবাস রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। এছাড়া তাঁর স্ত্রীর দখলে রয়েছে প্রায় ৩৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার।
গ্রামের বাড়ি: নিজ গ্রামে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন আলিশান ভবন।
বরাদ্দ বাণিজ্য ও ভুয়া পরিচয়ের ফাঁদ রাব্বি আলমের মূল টার্গেট বাসা বরাদ্দ প্রত্যাশী অসহায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বাসা বরাদ্দের বিনিময়ে তিনি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেন। এই টাকা আদায়ে তিনি আবাসন পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল নোমান ও বুলবুল হাসানের নাম ভাঙান। নিজেকে ‘সহকারী পরিচালক’ পরিচয় দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা ও চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছেন। এভাবে গত কয়েক বছরে তিনি প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
নেপথ্যে ‘দেশি ভাই’ সিন্ডিকেট এত বড় দুর্নীতির সাম্রাজ্য তিনি একা গড়েননি। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল নোমান। ‘অঞ্চল প্রীতি’ বা দেশি ভাই সম্পর্কের খাতিরে নোমান তাঁর এই অনুসারীকে সবসময় সুবিধাজনক ডেস্কে পোস্টিং দিয়ে রাখেন। বর্তমানে রাব্বি আলম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ডি-টাইপ’ শাখায় কর্মরত, যা বাসা বরাদ্দের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সহকারী পরিচালক নোমান নিজেও প্রায় ১০ বছর ধরে একই শাখায় খুঁটি গেড়ে আছেন এবং রাব্বি আলমের মাধ্যমেই এই ঘুষ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন।
কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা প্রশাসনের নাকের ডগাতেই একজন সাধারণ কর্মচারী কীভাবে এমন দুর্নীতির মহোৎসব চালাচ্ছেন, তা নিয়ে আবাসন পরিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে তোলপাড় চলছে। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. রাব্বি আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “… (এখানে সাংবাদিক হিসেবে আপনি তাঁর নেওয়া বক্তব্য বা তিনি ফোন না ধরলে ‘তাঁকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি’—এই অংশটি যুক্ত করবেন) …”



