আইন-শৃঙ্খলাদুর্নীতিপ্রশাসন

ভুয়া ফেসবুক পেজই যখন বন বিভাগের ‘নথি’: চট্টগ্রাম অঞ্চলে সক্রিয় অদৃশ্য সিন্ডিকেট, প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রমে এক নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দপ্তরের অভ্যন্তরীণ গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো যখন দিনের পর দিন ধামাচাপা পড়ে থাকছে, তখন ভিত্তিহীন ও মালিকানাবিহীন ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজের স্ট্যাটাসকে ‘আমলযোগ্য অপরাধ’ গণ্য করে গঠন করা হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের একাংশই দাবি করছেন, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দপ্তরের চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলছে এবং ভুয়া তথ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে।

ভুঁইফোড় পেজ যখন তদন্তের ভিত্তি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি ‘Bangladesh Crime Sector’ নামক একটি ফেসবুক পেজের পোস্টকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্যবহারিক বন বিভাগের ডিএফও মো. আলীর স্বাক্ষরে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই ফেসবুক পোস্টে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার হাবিবুল হক সুমনের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, যেই ফেসবুক পেজ বা আইডির ওপর ভিত্তি করে এই তদন্ত, বাস্তবে তার কোনো বৈধ মালিকানা, সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পরিচয় নেই। এমনকি তদন্ত কমিটি গঠনের চিঠির অনুলিপি ওই অস্তিত্বহীন ফেসবুক আইডি বরাবরও প্রেরণ করা হয়েছে। প্রশাসনিক শিষ্টাচার ও নিয়মবহির্ভূত এই কর্মকাণ্ডে খোদ বন বিভাগের ভেতরেই তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি দপ্তরের চিঠিপত্র একটি ভুয়া ফেসবুক আইডিতে প্রেরণ করার মাধ্যমে বন বিভাগ মূলত ওই অপপ্রচারকারী চক্রকেই স্বীকৃতি ও উৎসাহ দিয়েছে।”

তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও প্রশ্নবিদ্ধ নিরপেক্ষতা উক্ত তদন্ত কমিটিতে ডিএফও মো. আলী নিজেকে আহ্বায়ক এবং কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ঈদগাঁও রেঞ্জ কর্মকর্তা উজ্জ্বল হোসাইনকে সদস্য সচিব হিসেবে রেখেছেন। ৯ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পরবর্তীতে ওই ভুয়া ফেসবুক পেজেই প্রকাশ করা হয়। গোপনীয় সরকারি নথি কীভাবে অভিযোগকারী ভুয়া পেজের হাতে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয় বরং এর পেছনে বন বিভাগের ভেতরের কোনো যোগসাজশ রয়েছে, যা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়াকে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

নেপথ্যে সক্রিয় ‘ছায়া সিন্ডিকেট’ অনুসন্ধানে ও ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন বিভাগকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ‘ছায়া সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন মাঝারি পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মূল কাজ হলো—নামে-বেনামে ফেসবুক পেজ ও আইডি খুলে প্রতিপক্ষ বা অপছন্দের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানহানিকর, অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করা।

পরবর্তীতে সিন্ডিকেটের সদস্যরা সেই ভুয়া পোস্টগুলোকেই ‘সংবাদ’ বা ‘তথ্যসূত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করে উর্ধ্বতন দপ্তরে তদন্তের আবেদন করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কৌশলে সৎ কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয় এবং তদন্তের ভয় দেখিয়ে রেঞ্জার ও ডেপুটি রেঞ্জারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।

বদলির বাজার ও দুর্নীতির পাহাড় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, এই অপতৎপরতার মূল লক্ষ্য মূলত ‘বদলি বাণিজ্য’ এবং ‘লোভনীয় পোস্টিং’ নিয়ন্ত্রণ করা। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন বিভাগের পোস্টিং ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। পাহাড়সম দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকার পরও অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অথচ ভুয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি তদন্ত কমিটি গঠন করার বিষয়টি রহস্যজনক।

সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতটাই প্রভাবশালী যে, তারা কর্মকর্তাদের ছবি, নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে ধারাবাহিকভাবে সাইবার বুলিং চালিয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে এমন অরাজকতা চলতে থাকায় সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও দায়সারা ভাব এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও ডিএফও মো. আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেন যে, উর্ধ্বতন দপ্তরের নির্দেশে প্রাপ্ত নথির অনুলিপি হিসেবেই তিনি ওই ভুয়া ফেসবুক আইডিতে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, ‘Bangladesh Crime Sector’ নামে কোনো বৈধ সংবাদমাধ্যম বা বাস্তব কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। এটি একটি ভুয়া আইডি মাত্র।

অন্যদিকে, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার দিন তিনি ছুটিতে ছিলেন। ওই ফেসবুক আইডির কোনো প্রতিনিধি বা ব্যক্তি কখনো অফিসে আসেননি বা যোগাযোগ করেননি।

তবে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব উজ্জ্বল হোসাইন বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আইডিটি ভুয়া কি না, তা জানতে হলে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার সঙ্গেই কথা বলতে হবে। তার এই বক্তব্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উপসংহার বন বিভাগের মতো একটি সংবেদনশীল সংস্থায় ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তদন্ত কমিটি গঠন নজিরবিহীন ঘটনা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখনই এই অপতৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে না ধরলে চট্টগ্রাম বন বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়বে এবং দুর্নীতির শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হবে। অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের হোতাদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button