আইন, ও বিচারপ্রশাসন

রিজওয়ানা হাসানের নেতৃত্বে বন অধিদপ্তরের আমূল পরিবর্তন: আইন সংস্কার, ভূমি উদ্ধার ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক: অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা অচলায়তন ভেঙে আইন সংস্কার, জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধার, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বন অধিদপ্তর যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা পরিবেশবাদী ও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে।

আগস্ট ২০২৪ থেকে পরবর্তী সময়কালে নেওয়া নানামুখী উদ্যোগ বন অধিদপ্তরকে একটি শক্তিশালী ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুগান্তকারী আইন ও নীতিমালা সংস্কার

বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করা ছিল এই সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় বননীতি হালনাগাদ করে সেটিকে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬’ এবং ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ ২০২৬’ জারি। নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে:

  • অবৈধ বৃক্ষ কর্তন ও বনভূমি জবরদখল রোধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
  • বাঘসহ ২৪৭টি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী হত্যা বা পাচারকে ‘জামিন অযোগ্য অপরাধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
  • সুরক্ষা তালিকায় মোট ১,৫৭৪টি বন্যপ্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
  • মাঠ পর্যায়ে অপরাধ দমনে পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি এবং কাস্টমসকে বন্যপ্রাণী ও বনজ সম্পদ জব্দের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা আইন প্রয়োগে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

ভূমি দস্যুদের কবল থেকে বন উদ্ধার ও বরাদ্দ বাতিল

বনভূমি জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। তথ্যানুযায়ী, আগস্ট ২০২৪ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫,৭০০ একর জবরদখলকৃত বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে পুনরায় বনায়ন করা হয়েছে।

কক্সবাজার ও উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নেওয়া হয়েছে কঠোর সিদ্ধান্ত:

  • কক্সবাজার: বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, বাফুফের টেকনিক্যাল সেন্টার এবং বেজার অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত বনভূমির বন্দোবস্ত বাতিল করা হয়েছে।
  • সোনাদিয়া দ্বীপ: প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এই দ্বীপের প্রায় ৯,৪৬৬ একর বনভূমির বরাদ্দ বাতিল করে তা বনের আদলে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
  • সংরক্ষিত বন ঘোষণা: মহেশখালী উপজেলার সমুদ্রবিলাস ও বিজয় একাত্তর মৌজার মোট ৫,৩৩৫ একর ভূমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও জনসচেতনতা

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কেবল আইন নয়, বরং প্রযুক্তি ও জনসম্পৃক্ততাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

  • মেছোবিড়াল ও হাতি সুরক্ষা: ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো ‘বিশ্ব মেছোবিড়াল দিবস’ পালন করা হয়েছে। এছাড়া মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব নিরসনে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং পোষা হাতি শনাক্তকরণে মাইক্রোচিপ বসানো হয়েছে।
  • ক্ষতিপূরণ: বন্যপ্রাণীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে সরকার। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩৭ জনকে প্রায় ২ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
  • রেডলিস্ট হালনাগাদ: বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সুরক্ষায় ‘রেডলিস্ট’ হালনাগাদ করার প্রকল্প চলমান রয়েছে।

পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও সামাজিক বনায়ন

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পরিবেশের ক্ষতি রোধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। জাতীয় উদ্যান ও ইকোপার্কগুলোতে ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ এবং সব ধরনের বনভোজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি, উদ্ভিদ উদ্যানের প্রবেশ ফি যৌক্তিকভাবে পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে।

মধুপুর শালবন রক্ষায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। সেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে ১,১১১ একর এলাকায় বনায়ন চলছে। শালবনের ৪৫,৫৬৫ একর ভূমির সীমানা চিহ্নিতকরণ কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। চুনতি অভয়ারণ্যে ক্ষতিকর আকাশমনি গাছ অপসারণ করে দেশীয় প্রজাতির চারা রোপণ শুরু হয়েছে।

ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা ও মামলা প্রত্যাহার

বন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল হয়রানিমূলক মামলার। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে টাঙ্গাইল বন বিভাগে ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠীসহ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৮৮টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন ৩৮৭ জন মানুষ।

নগর বনায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

শহরের বায়ুদূষণ রোধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাথে যৌথভাবে ‘জিরো সয়েল’ কর্মসূচি ও সড়ক বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া ঢাকার পূর্বাচলে ১৪৪ একর শালবনকে ‘বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে, যা নগর পরিকল্পনায় একটি মাইলফলক।

প্রতিষ্ঠানের ভেতরও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। বন অধিদপ্তরে পৃথক ‘বন্যপ্রাণী উইং’ গঠন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘুচিয়ে ৪৫৪ জন ফরেস্টারকে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করেছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

বন অধিদপ্তরের এই আমূল পরিবর্তনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ফরেস্টার্স অ‍্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)-এর আহ্বায়ক কবি আমিরুল হাছান বলেন,

“অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে বন অধিদপ্তরের এসব উদ্যোগ বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এজন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বন অধিদপ্তরের এই সংস্কার ও কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button