
কে. এম. মাসুদুন্নবী নূহু
প্রায় দুই যুগ পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রায় সবাই জয়ী হয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই যে প্রধানমন্ত্রী হবেন, দলের পক্ষ থেকে তা আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। ওই নির্বাচনে বিএনপি একাই পেয়েছিল ১৯৩টি আসন। আর জোটের শরিকসহ তাদের মোট আসন ছিল ২১৬। তখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি একাই জয় পেয়েছে ২০৯টি। জোটের শরিকেরা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। সব মিলিয়ে পরবর্তী সংসদে বিএনপি জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২১২। তবে আরও দুটি আসনে জয়লাভের সম্ভাবনা আছে বিএনপির। আদালতের নির্দেশে এ দুটি আসনের ফল ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন যোগ হলে এই জোটের সদস্যসংখ্যা আরও বাড়বে। এবার বিএনপির হয়ে জয় পেয়েছেন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চারজন। তাঁরা হলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩), ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২), বান্দরবান থেকে সাচিং প্রু এবং রাঙামাটি থেকে দীপেন দেওয়ান।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঢাকা ও বগুড়া থেকে দুটি আসনে জয়ী হয়েছেন। এর আগে ’৯১, ’৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এবার নতুন প্রজন্মের হাত ধরে সরকার পরিচালনা করবে বিএনপি।
বিএনপির ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দলটির বিজয়ী সদস্যদের মধ্যে ধর্ম, লিঙ্গ, নবীন-প্রবীণের বৈচিত্র্য রয়েছে। সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে যাঁরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের সবাই জয়ী হয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই অতীতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবার নির্বাচিতদের মধ্যে ছয়জন নারী সদস্য রয়েছেন; যা অন্য দলে নেই। বিপুল সংসদীয় শক্তি দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখতে বিএনপির সামনে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা গা ছাড়া ভাবও তৈরি করতে পারে। তাই বিচ্যুতি থেকে সাবধান থাকতে হবে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরীর মতো প্রবীণ নেতারা যেমন আছেন, তেমনি সাঈদ আল নোমান, মীর হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশিদ, ফারজানা শারমীনের মতো তরুণেরাও নির্বাচিত হয়েছেন।
বিএনপির শরিকদের মধ্যে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি রাজনীতির মাঠে পরিচিত মুখ। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের ডাকসুর সাবেক ভিপি হিসেবে পরিচিতি আছে।
১১ দলীয় জামায়াত জোট:
এবার ১১ দলীয় জামায়াত জোট মোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে এনসিপি ৬ টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২ টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস- এই পাঁচটি দল একটি করে আসনে জয়ী হয়েছে। এছাড়া সাতটি আসনে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী।
নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার পর কীভাবে এবং কার কাছে শপথ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে কীভাবে বা কার কাছে শপথ পাঠ করা হবে, তার আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখছেন দলটির নেতারা। ১৭ তারিখের মধ্যে শপথ হতে পারে বলে বলছে বিএনপি।
১১ দলীয় জামায়াত জোটের অভিযোগ:
কারচুরি করে প্রার্থী নির্বাচন করা, বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটের ওপর ঘষামাজা করা এমনকি কিছু কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
কিছু আসন টার্গেট করে প্রশাসনকে ব্যবহার করে ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক আসনে নিজেদের বিজয় দাবি করে দেশব্যাপী দোয়া কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। তবে কোনো আনন্দ মিছিল বা সভা করা হয়নি। অপরদিকে পঞ্চগড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়াকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনে ভোট পুনরায় গণনার দাবিতে পাবনা জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
তারেক রহমানকে বিদেশীদের অভিনন্দন:
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে নির্বাচনে বিএনপিকে বিজয়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজের ভেরিফায়েড এক্স একাউন্টে একটি পোস্টে বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিএনপি জয়লাভ করায় তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ব্রিটিশ হাইকমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একইসঙ্গে তারা বিএনপির নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করারও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পরে ফোন করেও কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনৈতিক দলের ঢাকা নির্বাচন:
এবারের নির্বাচনে রাজধানীর ১৫টি আসনের মধ্যে ৮টি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। বাকি ৭টির মধ্যে ৬টিতে জামায়াতে ইসলামী জিতেছে। ১টি আসন পেয়েছে জামায়াতের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ৯১ সাল থেকে নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যে দলই সরকার গঠন করেছে, তারা রাজধানী ঢাকার আসনগুলোতে একচেটিয়া জয়ী হয়েছে। ’৯১ সালে বিএনপি রাজধানীর সব আসনে জয়ী হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। একইভাবে ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। একমাত্র ঢাকা-৭ আসনটি ছাড়া বাকি সব কটিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে রাজধানীর সব কটি আসনে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থীরা।
একইভাবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা ঢাকার সব আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। রাজধানী ঢাকা রাজনৈতিক কর্মকা-, বিরোধী দলের আন্দোলন- কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য নিজ দলের সংসদ সদস্যরা থাকলে কিছুটা নিরাপদ বোধ করে ক্ষমতাসীন দল। অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, বিপুল সংসদীয় শক্তি দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখতে বিএনপির সামনে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা গা ছাড়া ভাবও তৈরি করতে পারে। তাই বিচ্যুতি থেকে সাবধান থাকতে হবে। কিছু জেলায় একেবারে আসন না পাওয়াকে সাংগঠনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন মাহবুব উল্লাহ। তিনি মনে করেন, এমন সমস্যা আরও কোথাও থাকলে তা কাটিয়ে ওঠার জন্য তৎপর হওয়া জরুরি
বিএনপির যত আছে চ্যালেঞ্জ:
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ মানুষ। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ মানুষ। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার ফলে নতুন সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। অবশ্য গণভোটের আগে দীর্ঘ আট মাস বৈঠক করে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ সই করে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক করতে পারেনি। এখন গণভোটের ফলের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেড় হাজারের মতো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা আছে। শেখ হাসিনাসহ জুলাই হত্যাকা-ে জড়িতদের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ইতিমধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদ- হয়েছে। আরেকটি মামলায় পুলিশের সাবেক কয়েকজন সদস্যের মৃত্যুদ-ের রায় হয়েছে। এই বিচার চালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বর্তাবে নতুন সরকারের ওপর।
নতুন সংসদ বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত এবং প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে জামায়াতে ইসলামী:
নতুন সংসদ বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত হতে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে জামায়াতে ইসলামী। গত দুই যুগের মধ্যে জামায়াত সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারকে আর্থসামাজিক ও সংস্কারের মতো নানা জটিল বিষয়ের সমাধান করতে হবে। সংসদের ভেতরে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বিরোধী দলকে মোকাবিলা করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে নির্বাহী আদেশে। বিএনপি সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে তাদের অবস্থান কী হবে, সেটাও একটা রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হতে পারে। এবার জাতীয় সংসদ অপেক্ষাকৃত বড় বিরোধী দল পাচ্ছে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ ৮৭ আসন আর ১৯৯৬ সালে বিএনপি ১১৬ আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। ২০০১ সালে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আসন ছিল ৬২টি। এরপরের সংসদগুলোতে প্রধান বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা ৩০ পার হতে পারেনি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩০ আসন নিয়ে বিএনপি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ওই নির্বাচনে বাকি সব আসন আওয়ামী লীগ, তাদের মিত্র জাতীয় পার্টি ও শরিকেরা পায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে অল্প কিছু আসন নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে জাতীয় পার্টি। অবশ্য একই সঙ্গে জাতীয় পার্টির নেতাদের মন্ত্রীর ভূমিকায়ও দেখা গেছে। এ জন্য তাদের ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল বলা হতো। অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের পর এবারই সবচেয়ে বেশি সদস্য নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় আসছে জামায়াত জোট। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী ঐক্য এবার ৭৭ জন সদস্য নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাচ্ছে। এই সংখ্যা ২০০১ সালের পর সবচেয়ে বেশি। সংখ্যা বেশি হলেও জামায়াতে ইসলামীর দুর্বলতা হচ্ছে, দলটির প্রবীণ সদস্যরা অধিকাংশই জীবিত নেই। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এবার নির্বাচনে হেরে গেছেন।
বিএনপির কিছু নেতার পরাজয় ৮ জেলার ৩০ আসনে শূন্য:
এবার নির্বাচনে বিএনপি দেশের দক্ষিণ, মধ্য, পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় কম আসন পেয়েছে দলটি।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা—এই আট জেলায় কোনো আসনই পায়নি বিএনপি। জেলাগুলোতে মোট আসনসংখ্যা ৩০। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গায় অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে বিএনপি জয় পেয়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হারুন অর রশিদ জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন। তিনি বিএনপির হয়ে চারবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।
এর মধ্যে ২০১৮ সালের বিপর্যয়কর নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করেছিলেন। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও হারুন অর রশিদ বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে জয়ী হন। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরেকটি আসনে শাহজাহান মিঞা তিনবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। এবার তিনি হেরে গেছেন।একইভাবে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার দুটি করে চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা অতীতে একাধিকবার জয়ী হয়েছিলেন। এবার এই দুই জেলার চারটি আসন জামায়াতের দখলে গেছে। কুড়িগ্রামে বিএনপি বরাবর দুর্বল হলেও এবার জাতীয় পার্টির দুরবস্থার সুযোগ নিতে পারেনি দলটি।
চলতি মাসের ১৭ তারিখের মধ্যে শপথ হতে পারে বলে বলছে বিএনপি:
নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার পর কীভাবে এবং কার কাছে শপথ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে কীভাবে বা কার কাছে শপথ পাঠ করা হবে, তার আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখছেন দলটির নেতারা। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে শুক্রবার রাতে দেখা করেছেন বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা। এরপর দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এখন কীভাবে বা কার কাছে শপথ নেওয়া হবে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। যদি গেজেট হয়ে যায়, স্পিকার ডেপুটি স্পিকারের সুযোগ না থাকায়, তখন তিনদিনের মধ্যে সিইসির শপথ পড়ানোর সুযোগ নেওয়া যায়। সেই হিসাবে ১৭ তারিখের মধ্যে শপথ হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, যেদিন সকালে সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন, সেদিন বিকালেই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। বর্তমান আইন অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার শপথ পড়াবেন। সেটা না হলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির কাছে শপথ নেওয়া যাবে। কিন্তু স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অসমর্থ হলে তিনদিন পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়াবেন। বর্তমানে কে কীভাবে শপথ পড়াবেন, তার আইনি ব্যাখ্যা নিচ্ছে বিএনপি। তবে সর্বশেষ চূড়ান্ত হয়েছে, শপথ বাক্য পাঠ করবেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু। এ সরকারের মন্ত্রী পরিষদ ৪৫ বিশিষ্ট হতে পারে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে আনঅফিসিয়ালি ভাবে জানানো হয়েছে, তবে শীঘ্রই এ বিষয়ে চূড়ান্ত হবে।
২০২৬ শুক্রবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জয়ী হয়েছে ২১২টি আসনে। সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটে ৫৯ দশমিক ৪৪ ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোট মোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এর মধ্যে এনসিপি ৬টি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস- এই পাঁচটি দল ১টি করে আসনে জয়ী হয়েছে।
এছাড়া ৭টি আসনে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী। নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হওয়ার পর কীভাবে এবং কার কাছে শপথ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে কীভাবে বা কার কাছে শপথ পাঠ করা হবে, তার আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখছেন দলটির নেতারা।
১৭ তারিখের মধ্যে শপথ হতে পারে বলে বলছে বিএনপি। কারচুরি করে প্রার্থী নির্বাচন করা, বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটের ওপর ঘষামাজা করা এমনকি কিছু কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
কিছু আসন টার্গেট করে প্রশাসনকে ব্যবহার করে ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক আসনে নিজেদের বিজয় দাবি করে দেশব্যাপী দোয়া কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। তবে কোনো আনন্দ মিছিল বা সভা করা হয়নি। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে নির্বাচনে বিএনপিকে বিজয়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজের ভেরিফায়েড এক্স একাউন্টে একটি পোস্টে বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিএনপি জয়লাভ করায় তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ব্রিটিশ হাইকমিশন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। একইসঙ্গে তারা বিএনপির নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করারও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পরে ফোন করেও কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পঞ্চগড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়াকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনে ভোট পুনরায় গণনার দাবিতে পাবনা জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।



