অপরাধদুর্নীতি

বন্দরের কর্মকর্তা শিহাবের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশের পরও অগ্রগতি নেই, বদলির আদেশও নিষ্ক্রিয়!

চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সহকারী ব্যবস্থাপক (ভূমি-১) মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, কিন্তু নির্দেশ জারির দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত অগ্রগতি না থাকায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গত বছরের ১১ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে এবং ১২ নভেম্বর অভিযোগটি যুগ্ম সচিবের নিকট ডায়েরি নং-১০৮২, অতিরিক্ত সচিব (বন্দর) দপ্তরে ডায়েরি নং-১৩৯৮ এবং ১৩ নভেম্বর উপসচিবের নিকট ডায়েরি নং-৪৪৬ হিসেবে গৃহীত হয়।

পরবর্তী সময়ে ২৫ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের চবক শাখার উপসচিব কাজী মোহাম্মদ চাহেল তস্তরী স্বাক্ষরিত পত্রে বন্দর চেয়ারম্যানকে অভিযোগটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। পত্রটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগে স্মারক নং-২৮৭৬ এবং চেয়ারম্যানের দপ্তরে স্মারক নং-৯৭০ হিসেবে গৃহীত হয়, মূল পত্রের স্মারক নম্বর ছিল ৩৯০—অর্থাৎ নথিপত্রে দ্রুত অগ্রগতির স্পষ্ট চিহ্ন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তদন্ত কার্যক্রমের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) স্বাক্ষরিত দপ্তরাদেশ নং-১৩০/২৪ অনুযায়ী শিহাব উদ্দিনকে ডেপুটি ম্যানেজার (ভূমি) পদে চলতি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিজ পদ সহকারী ব্যবস্থাপক (এস্টেট-১) হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ ত্বরান্বিত করা, অধিগৃহীত জমির সীমানা পিলার স্থাপন, বন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএ-সংক্রান্ত জটিলতা নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন সমন্বয়মূলক দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে তিনি এখনো চট্টগ্রাম বন্দরে বহাল রয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসনিক আদেশ বাস্তবায়নের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) অবসর গ্রহণের পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে শিহাব উদ্দিনকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও দায়িত্ব গ্রহণের আগেই নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ ও দুর্নীতিসংক্রান্ত একাধিক সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল; এছাড়া ২০২১ সালের দিকে মাতারবাড়ি বন্দরের জমি অধিগ্রহণ ইস্যুতে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে শোকজ করার ঘটনাও রয়েছে।

রয়েছে কর্ণফুলী নদীর জায়গা ইজারা বিতর্ক এবং প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের আট একর জমি টেন্ডারবিহীন ইজারা দেওয়ার আলোচিত ঘটনার সঙ্গেও এস্টেট শাখার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, পরবর্তীতে সেই ইজারা বাতিল করা হয়—তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলিই আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি না হওয়ায় বাস্তব সত্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, বন্দরের কিছু গোপন নথি সীমিত সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মীর কাছে পৌঁছানো, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের গুঞ্জন এবং নতুন ফিশারিঘাট এলাকার জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক—এসব বিষয়েও তাঁর নাম ঘুরেফিরে এসেছে, যদিও এসব অভিযোগের সরকারি প্রমাণ এখনো প্রকাশ পায়নি।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) তদন্ত করছেন এবং গত ১৩ মাসে তাঁর দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের ভূমিকাও দেখা প্রয়োজন; পাশাপাশি মাতারবাড়িতে কার্যকর অফিস না থাকায় সেখানে অবস্থান বাস্তবসম্মত নয় বলেও তিনি দাবি করেন।’

তদন্ত কর্মকর্তা ও বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলামের মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অভিযোগটি তদন্তাধীন এবং বদলির আদেশ বাস্তবায়ন হয়নি কেন সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) দেলোয়ারা বেগম বলেছেন অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন অভিযোগগুলো যাচাই করা হচ্ছে, অনিয়ম পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে—তবে তদন্তের সময়সীমা বা অগ্রগতির নির্দিষ্ট তথ্য কেউ উল্লেখ করেননি।

ফলে মূল প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে—তদন্ত শুরু হতে এত বিলম্ব কেন, বদলির আদেশ কার্যকর হয়নি কেন, পূর্বের অভিযোগগুলো নিষ্পত্তিহীন কেন এবং দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে—যার স্পষ্ট উত্তর মিললে তবেই দূর হবে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক নীরবতাকে ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘ ছায়া।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button