গণপূর্তে ‘অদৃশ্য শক্তি’ প্রকৌশলী মাসুদ রানা: ক্ষমতার ছায়ায় শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে আগের আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য থামছে না। অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রাজনৈতিক ভোল পাল্টে কিংবা কৌশলে নিজেদের আড়াল করে এখনো দাপট বজায় রেখেছেন। এমন এক আলোচিত নাম নগর গণপূর্ত বিভাগ (ঢাকা-৪)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাসুদ রানা। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এখন উত্তাল গণপূর্ত অধিদপ্তর।
টেন্ডার জালিয়াতি ও অগ্রিম অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মাসুদ রানার দুর্নীতির কৌশল ছিল বহুমুখী। টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়া, কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিল উত্তোলন এবং অস্তিত্বহীন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, তার নির্ধারিত কমিশন ছাড়া কোনো বিল পাশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
‘বিশেষ আশীর্বাদে’ উত্থান ও অদৃশ্য ক্ষমতা সূত্রমতে, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন প্রভাবশালী সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মাসুদ রানার ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়। এরপর তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। এমনকি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তার ‘ক্যাশিয়ার’ বা অর্থ সংগ্রাহক হিসেবেও তিনি পরিচিতি পান।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, দুর্নীতির দায়ে তাকে কয়েকবার বদলি করা হলেও অদৃশ্য শক্তিবলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। অনেকের মতে, এই প্রকৌশলীর প্রভাবের কাছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও যেন অসহায়।
সম্পদের পাহাড়: গুলশান থেকে মোহাম্মদপুর অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে মাসুদ রানা গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার সম্পদ। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের যে তালিকা পাওয়া গেছে তা পিলে চমকানোর মতো:
গুলশান: ঘনিষ্ঠ এক ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
বনশ্রী: ডি-ব্লকে (বাসা নং ৫৪/ডি) ৫ তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এছাড়া এফ-ব্লকের মোল্লা ম্যানশনে স্ত্রীর নামে আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা সিটি: বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলায় (বি ব্লক) দুটি মূল্যবান দোকান। মোহাম্মদপুর: বাবর রোডে (রোড-৯, বাসা-১৮৯/এ) নিজের নামে ১০ কাঠার একটি বিশাল প্লট, যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি।
অন্যান্য: এছাড়া মোহাম্মদপুর ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে। প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে অধিদপ্তরে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সংস্কারের এই সময়ে এসেও যদি এসব ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার উত্তরাধিকারী’রা বহাল তবিয়তে থাকেন, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের দাবি, এই প্রকৌশলীর অবৈধ সম্পদের দ্রুত নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।



