দুদকের মামলার আসামি হয়েও বিমানবন্দরে ‘ভিআইপি প্রোটোকল’: এনবিআর কর্মকর্তা বেলালের দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি হয়েও বিমানবন্দরে বিশেষ ভিআইপি প্রোটোকল সুবিধা ভোগ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা বেলাল হোসেন চৌধুরী। বর্তমানে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে কর্মরত এই কর্মকর্তার এমন ‘ভিআইপি খাতির’ নিয়ে খোদ প্রশাসনের অন্দরেই তোলপাড় শুরু হয়েছে।
বিধিবহির্ভূত প্রোটোকল ও গোপনীয়তা গত ১৭ জানুয়ারি দুবাই থেকে আসা তার আমেরিকান নাগরিক ছেলেকে অভ্যর্থনা জানাতে স্ত্রীসহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করেন বেলাল হোসেন চৌধুরী। অভিযোগ উঠেছে, প্রোটোকল সুবিধা গ্রহণের সময় নথিতে তার ‘ওএসডি’ পদবিটি কৌশলে গোপন করা হয়েছে, যা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, তার স্ত্রীও দুদকের একই মামলার অন্যতম আসামি।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, কাস্টম হাউসের কমিশনার কিংবা এনবিআর চেয়ারম্যানের লিখিত অনুমোদন ছাড়া একজন ওএসডি এবং মামলার আসামি কীভাবে এমন স্পর্শকাতর এলাকায় ভিআইপি সুবিধা পেলেন? তল্লাশি ছাড়াই পার: পাচারের শঙ্কা ভিআইপি প্রোটোকল সুবিধার আওতায় যাত্রীদের ব্যাগেজ স্ক্যানিং বা কায়িক তল্লাশি ছাড়াই বিমানবন্দর ত্যাগের সুযোগ থাকে। বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিতর্কিত অতীত এবং দুবাই কানেকশনের কারণে এই সুযোগ ব্যবহার করে কোনো অবৈধ পণ্য বা অর্থ পাচার হয়েছে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও দুদকের নজরদারি গত ৭ অক্টোবর জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের উপ-পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর তাকে ওএসডি করা হলেও গত তিন মাস ধরে তিনি নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত। দুদক যখন তাকে খুঁজছে, তখন খোদ বিমানবন্দরের মতো সুরক্ষিত জায়গায় তার প্রকাশ্য উপস্থিতি এবং প্রোটোকল পাওয়া প্রশাসনের নজরদারি ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা? দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও তার বিরুদ্ধে এখনো ‘ডেজারশন’ (চাকরি ত্যাগ) বা কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারি আদেশ (জিও) ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের মতো গুরুতর অভিযোগে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ (আইআরডি) কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
উপসংহার: জবাবদিহিতা কোথায়? দুদকের মামলার আসামি হওয়ার পরও একজন কর্মকর্তার এমন অপ্রতিভ প্রভাব প্রমাণ করে যে, আমলাতন্ত্রের গভীরে এখনো কিছু ‘সুরক্ষিত বলয়’ সক্রিয় রয়েছে। সচেতন মহল দাবি করছেন, অবিলম্বে এই প্রোটোকল কেলেঙ্কারির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং পলাতক এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করা মামলার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরীকে বদলি করা হয়েছে। তাকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও মূল্য সংযোজন কর আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফর রহমানকে এনবিআরের সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
বুধবার (৮ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ বদলির তথ্য জানানো হয়। একইসঙ্গে বেলাল হোসেন চৌধুরীকে এনবিআর থেকে অবমুক্ত করে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করে।
সংস্থাটির উপ-পরিচালক মো: সাইদুজ্জামান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৬০ লাখ ১৯ হাজার ৭১৩ টাকার সম্পদ অর্জন এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি আদালত তার বিদেশ গমনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।



