আন্তর্জাতিক

সৌদি-মার্কিন পরমাণু চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির পুনর্বিন্যাসের নতুন সমীকরণ

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক

রিয়াদ/ওয়াশিংটন: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তির খবরটি বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নতুন এক কৌশলগত মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির চিরাচরিত ভারসাম্য ভেঙে এক নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হতে পারে।

১. নিরাপত্তা শর্তে নমনীয়তা ও মার্কিন কৌশল

প্রতিবেদনে জানা গেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সাধারণত প্রচলিত কঠোর নিরাপত্তা শর্ত বা ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ আরোপ না করেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। মূলত ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করতেই সৌদি আরবকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার এই ‘বাস্তববাদী রাজনীতি’ বা রিয়েলপলিটিক (Realpolitik) বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন।

২. পারমাণবিক সক্ষমতার পথে সৌদি আরব?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরব ভবিষ্যতে ইরান বা পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উন্নয়ন কর্মসূচি’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে, তবে কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে ভবিষ্যতে এর সামরিক ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

“পারমাণবিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের মধ্যে ব্যবধান মূলত একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কারিগরি সক্ষমতা অর্জিত হলে কৌশলগত ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।” — সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকগণ।

৩. আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব

এই সম্ভাব্য চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার (Nuclear Arms Race) সূচনা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে:

  • ইরানের প্রতিক্রিয়া: সৌদি আরবের এই অগ্রসর অবস্থান ইরানকে তাদের নিজস্ব পারমাণবিক কর্মসূচি আরও দ্রুততর করতে প্ররোচিত করতে পারে।
  • আঞ্চলিক নিরাপত্তা: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোও নিরাপত্তার অজুহাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের দাবি তুলতে পারে।
  • এনপিটি (NPT) ব্যবস্থার সংকট: পারমাণবিক বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক যে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো রয়েছে, এই চুক্তির ফলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

৪. মুসলিম বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তনের ঢেউ

সৌদি আরব পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করলে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বে নতুন প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে, বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের যে একক কৌশলগত অবস্থান রয়েছে, তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কের সমীকরণ এতে আমূল বদলে যেতে পারে।

৫. দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, এই চুক্তির ফলে কয়েকটি গভীর সংকট তৈরি হতে পারে:

  • শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তির সামরিক প্রয়োগের ঝুঁকি।
  • পারমাণবিক প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার।
  • আঞ্চলিক সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি।
  • বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা।

উপসংহার: সৌদি-মার্কিন এই সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক বা প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় এই চুক্তি ভবিষ্যতে কী ধরনের ভূমিকা রাখে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button