যাত্রাবাড়ীতে চালককে পিটিয়ে হত্যা: চাঁদাবাজির মরণনেশা ও নেপথ্যের ‘শক্তির উৎস’ নিয়ে উদ্বেগ

মোঃ জাকিরুল ইসলাম
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় চাঁদা লেনদেনকে কেন্দ্র করে এক গাড়িচালককে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে জেঁকে বসা চাঁদাবাজির এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শক্তির উৎস কোনো ব্যক্তিগত বীরত্ব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর কাঠামোগত ভিত্তি।
চাঁদাবাজদের শক্তির মূলে কী?
যাত্রাবাড়ীর এই ঘটনার পর চাঁদাবাজির শক্তির উৎস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজদের এই দানবীয় ক্ষমতা মূলত পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
- ভয় ও জবরদস্তি: তাদের প্রধান অস্ত্র হলো সাধারণ মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করা। শারীরিক সহিংসতা ও হুমকির মাধ্যমে তারা লক্ষ্যবস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
- রাজনৈতিক ছত্রছায়া: স্থানীয় রাজনীতি, নির্বাচন বা সংগঠনের দাপট দেখিয়ে চাঁদাবাজরা কার্যত একটি রক্ষাকবচ পেয়ে যায়। রাজনৈতিক পরিচয় তাদের অপরাধকে তথাকথিত ‘বৈধতা’ বা সুরক্ষা দেয়।
- প্রশাসনের নির্লিপ্ততা ও দায়মুক্তি: অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বা ‘কালচার অফ ইমপিউনিটি’ তাদের আরও সাহসী করে তোলে। সময়মতো আইন প্রয়োগ না হওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
- অর্থনৈতিক প্রবাহ: পরিবহন সেক্টর, ফুটপাত ও নির্মাণ খাতের নিয়মিত নগদ অর্থ চাঁদাবাজদের টিকে থাকার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এই অর্থের ভাগ অনেক স্তরে পৌঁছায় বলে এটি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- সামাজিক নীরবতা: নিরাপত্তার অভাব ও হয়রানির ভয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ না করা বা নীরব থাকাকে চাঁদাবাজরা তাদের পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে ধরে নেয়।
বিশ্লেষকের অভিমত
এ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল নজরদারির অভাব এবং নগদ লেনদেনের আধিপত্য অপরাধীদের আড়াল দিচ্ছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও স্বচ্ছতার অভাবে চাঁদাবাজরা তাদের অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে সক্ষম হচ্ছে।
সমাধানের পথ কী?
যাত্রাবাড়ীর চালকের মতো আর কারো প্রাণ যেন ঝরে না পড়ে, সেজন্য প্রতিবেদনে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে:
- সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ: ব্যবসায়ী সমিতি ও নাগরিক কমিটিকে একজোট হয়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
- প্রশাসনিক কঠোরতা: দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
- স্বচ্ছ লেনদেন: ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ও ফি-তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ কমাতে হবে।
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা: দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
উপসংহার: সংক্ষেপে বলতে গেলে— ভয়, দায়মুক্তি, রাজনৈতিক সহায়তা, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং সামাজিক নীরবতা—এই পাঁচের যোগফলের নামই চাঁদাবাজির শক্তি। এই চক্র না ভাঙলে নিরীহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যাত্রাবাড়ীর এই রক্তপাত যেন আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের সূচনা করে।



