আইন-শৃঙ্খলা

আন্দরকিল্লায় প্রকাশ্যে স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে অপহরণচেষ্টা টহল পুলিশের তৎপরতায় রক্ষা গ্রেফতার পাঁচ

মুহাম্মদ জুবাইর

চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন আন্দরকিল্লা এলাকায় প্রকাশ্যে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে মারধর করে জোরপূর্বক অপহরণের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।টহল পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে অপহরণচেষ্টা ভেস্তে যায় এবং ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়।এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের হয়েছে।পুলিশ একটি নোহা মাইক্রোবাস জব্দ করেছে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের গেইটের সামনে পাকা রাস্তার উপর। আহত ব্যবসায়ী দোলন ধর কোতোয়ালী থানায় দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ করেন, তিনি কোতোয়ালী থানাধীন হাজারী গলিতে একটি স্বর্ণের দোকান পরিচালনা করেন। গত ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দ্বিতীয় বিবাদীর মাধ্যমে প্রথম বিবাদীর কাছে তিনি একটি স্বর্ণের দোকান বিক্রি করেন। সেই সূত্রে বিবাদীদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

এজাহারে বলা হয়,২৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাদী তাদের মোবাইল ফোন থেকে দোলন ধরের নম্বরে কল করে দোকান ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনার জন্য আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের গেইটের সামনে যেতে অনুরোধ করেন।তাদের কথায় বিশ্বাস করে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া বিবাদীরা তাকে ঘিরে ধরে।তারা একটি কালো রঙের নোহা মাইক্রোবাসে জোর করে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ,তিনি গাড়িতে উঠতে অস্বীকৃতি জানালে বিবাদীরা এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে। একপর্যায়ে তার হাত ধরে টেনে গাড়িতে তুলতে চেষ্টা করা হয়।তিনি চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হতে থাকে। এ সময় গাড়ির চালকের আসনে থাকা পঞ্চম বিবাদী দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে সামনে উৎসুক জনতার ভিড় থাকায় গাড়িটি আটকে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে কোতোয়ালী থানার টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দোলন ধরকে উদ্ধার করে।পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্রথম থেকে ৫ নম্বর পর্যন্ত বিবাদীকে গাড়িসহ আটক করে।তাদের সঙ্গে থাকা আরও দুই থেকে তিনজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি কৌশলে পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

আটক ব্যক্তিরা হলেন সঞ্জয় তালুকদার, রঞ্জন দাস, মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, মাহফুজুর রহমান এবং মোহাম্মদ পারভেজ। পারভেজ গাড়ির চালক বলে পুলিশ জানিয়েছে। সকলের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।

ঘটনার পর আহত দোলন ধর আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। চিকিৎসাপত্র মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিবাদীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বেআইনি জনতাবদ্ধে মিলিত হয়ে তাকে মারধর করে জোরপূর্বক অপহরণের চেষ্টা করেছে। এ ঘটনায় তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে।

কোতোয়ালী থানায় দায়ের হওয়া মামলাটি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ১৪৩, ৩২৩, ৩৬৫, ৫১১ ও ৩৪ ধারায় রুজু করা হয়েছে। মামলার নম্বর ৪২, তারিখ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মামলা রুজুর পর খতিয়ানে নথিভুক্ত করা হয় এবং আসামিদের আদালতে প্রেরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে চট্ট মেট্রো চ ১১ ৯৬৫৭ নম্বরের একটি নোহা মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়েছে। গাড়িটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরও জব্দ তালিকায় উল্লেখ রয়েছে। জব্দ কার্যক্রমে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাব ইন্সপেক্টর শেখ তারিকুল ইসলাম। রেকর্ডিং কর্মকর্তা ছিলেন ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এজাহারে দোলন ধর উল্লেখ করেন, আহত অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ এবং পরিবার পরিজনের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় এজাহার দায়ের করতে সামান্য বিলম্ব হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনার পরপরই টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় বড় ধরনের অপহরণকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে এ ঘটনার পর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রকাশ্যে একজন ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে মারধর ও অপহরণের চেষ্টা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। তবে পুলিশ বলছে, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেই ভুক্তভোগীকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, দণ্ডবিধির ৩৬৫ ধারা অনুযায়ী অপহরণ গুরুতর অপরাধ। ৫১১ ধারা যুক্ত হওয়ায় এটি অপহরণের চেষ্টা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ১৪৩ ধারা বেআইনি জনতাবদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ৩২৩ ধারা স্বেচ্ছায় আঘাত করার অপরাধ নির্দেশ করে। ৩৪ ধারা অভিন্ন অভিপ্রায়ে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।


পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ঘটনার পেছনে দোকান ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত আর্থিক বা অন্যান্য বিরোধ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নগরবাসী আশা করছেন, এ ঘটনায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোতোয়ালী থানা পুলিশ জানিয়েছে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button