প্রশাসন

প্রশাসনে জবাবদিহিতা ছাড়া মন্ত্রীদের আকস্মিক ভিজিট ‘অর্থহীন’

অধ্যাপক এম এ বার্ণিক | ঢাকা ৫ মার্চ ২০২৬

সরকারি অফিসগুলোতে কাঠামোগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে কেবল মন্ত্রীদের আকস্মিক ভিজিট দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল বয়ে আনবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষক অধ্যাপক এম এ বার্ণিক। তাঁর মতে, টেকসই প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি, প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রতীকী তাৎপর্য গত ৪ মার্চ সকাল ৯টায় নারায়ণগঞ্জের একটি ভূমি অফিসে আকস্মিক পরিদর্শনে যান ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। নির্ধারিত সময়ে অফিস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তিনি দেখতে পান অফিসে তালা ঝুলছে। এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পিয়ন এসে দরজা খোলেন এবং এরপর কর্মচারীরা একে একে উপস্থিত হতে শুরু করেন। এই ঘটনাকে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং চেইন অব কমাণ্ডের চরম দুর্বলতার একটি ‘প্রতীকী চিত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অধ্যাপক বার্ণিক।

আকস্মিক ভিজিট কেন স্থায়ী সমাধান নয়? অধ্যাপক বার্ণিকের মতে, শীর্ষ পর্যায়ের এ ধরনের পরিদর্শন বড়জোর একটি সতর্কবার্তা হতে পারে, তবে এটি কোনো কাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। ভিজিটের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাময়িকভাবে ‘ভয়-ভিত্তিক’ একটি শৃঙ্খলা তৈরি হয়। কয়েকদিন সময়ানুবর্তিতা দেখা গেলেও পরে আবার পুরনো অভ্যাস ফিরে আসে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, টেকসই শৃঙ্খলা আসে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি থেকে, ভয় থেকে নয়।

গোয়েন্দা নজরদারি ও গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য অধ্যাপক বার্ণিক তিনটি স্তম্ভের সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন: রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গোয়েন্দা নজরদারি ও স্বাধীন গণমাধ্যম।

  • সক্রিয় গোয়েন্দা তদারকি: ডিজিএফআই (DGFI), এনএসআই (NSI) বা সিআইডি (CID)-এর মতো সংস্থাগুলোর ভূমিকা কেবল জাতীয় নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহেও কাজে লাগানো উচিত। নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ের অফিস উপস্থিতি, সেবার মান এবং দালাল চক্রের তথ্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে দায়িত্বহীনতা কমে আসবে।
  • প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিকতা: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মতৎপরতা ও সময়ানুবর্তিতা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে, যা ইতিবাচক। তবে গণমাধ্যমকে কেবল ক্ষমতার বন্দনা না করে, ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাধারণ মানুষ কতটা হয়রানির শিকার হচ্ছে—তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে তুলে আনতে হবে।

প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৫ দফা প্রস্তাব অধ্যাপক এম এ বার্ণিক প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ৫টি বাস্তব পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন: ১. বায়োমেট্রিক উপস্থিতি: সব সরকারি অফিসে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করে তা কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত করা। ২. গোপন মূল্যায়ন: গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক গোপন মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি। ৩. পদোন্নতির মাপকাঠি: কেবল জ্যেষ্ঠতা নয়, কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করা। ৪. সাংবাদিকদের নিরাপত্তা: মাঠপর্যায়ের অনিয়ম তুলে ধরতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ৫. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া।

অধ্যাপক বার্ণিক তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে বলেন, “রাষ্ট্রের শক্তি তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয় থেকে নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকে সময়মতো অফিসে আসবেন। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া যেকোনো আকস্মিক পরিদর্শন কেবলই অর্থহীন প্রয়াস।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button